গাইবান্ধা প্রতিনিধি: গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে মানবপাচারের মিথ্যা মামলার ফাঁদে ফেলে হয়রানির শিকার হয়েছেন সৌদি প্রবাসীর পরিবার, পল্লী চিকিৎসক ও জনপ্রতিনিধিসহ অনেকে। টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে একটি সংঘবদ্ধ চক্র মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রামের মানুষদের হয়রানির ঘটনায় আতঙ্ক আর উদ্বেগ বাড়ছে স্থানীয়দের মাঝে।

জানা যায়, উপজেলার রামজীবন ইউনিয়নের সুবর্ণদহ গ্রামের আলমগীর মণ্ডল দেড় যুগ ধরে কাজ করছেন সৌদি আরবে। দুই বছর আগে তার সহযোগিতায় সৌদি আরবে যান একই গ্রামের জিয়াউর রহমান, জামিউল ইসলাম, কবির উদ্দিন ও আল আমীন নামের ৪ ব্যক্তি। প্রথমে একটি কোম্পানিতে কর্মরত থাকা অবস্থায় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাদের ছাঁটাই করে মালিকপক্ষ।
আর সেখান থেকেই শুরু হয় মানব পাচারের অভিযোগ। বিদেশ নিয়ে যাওয়ার সেই সহযোগিতাই যেন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে আলমগীরের। তার পরিবারকে ডুবিয়েছে মিথ্যা মামলার জালে। একের পর এক মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে ওই প্রবাসীর পরিবারসহ তার শশুর পরিবারের লোকজনকেও।

শুরু থেকেই দুই পরিবারকে হয়রানির ফাঁদে ফেলার অভিযোগ উঠে, ইতালি প্রবাসী শরীয়তপুরের সুমন ব্যাপারী, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার শান্তিরাম ইউনিয়নের পরান গ্রামের সৌদি প্রবাসী আনজু মিয়া ও তাদের স্থানীয় সহযোগী দহবন্দ ইউনিয়নের দক্ষিণ ধুমাইটারি গ্রামের মিঠু মিয়ার (ফিটু) বিরুদ্ধে। মূলত: টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রথমে তারা মামলার ভয়ভীতি ও পরে মামলা মিমাংসার জন্য ফোনে হুমকি দেয়। কয়েক দফায় ভুক্তভোগীদের হুমকি-ধামকি দিয়ে ৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায় প্রতারকদের দেওয়া অডিও কলে।
এমন অডিও কলের সত্যতা জানতে সরেজমিনে ভুক্তভোগী প্রবাসী আলমগীর মণ্ডলের গ্রামের বাড়ি ও তার শশুর বাড়িতে গেলে কথা হয় প্রবাসী আলমগীর মণ্ডলের স্ত্রী মৌসুমি বেগম, বাবা মুসলিম আলী, শশুর মঞ্জু মিয়া ও শ্যালক মামুন মিয়াসহ পরিবারের সদস্যের সাথে।

তারা বলেন, গত এক বছরে সুমন, আনজু ও ফিটু মিলে তাদের পরিচিতদের ভুক্তভোগী সাজিয়ে সুন্দরগঞ্জ থানা ছাড়াও চাঁদপুর, টাঙ্গাইল, সাভার ও চাপাইনবাগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন থানায় ৫-৬টি মানব পাচারের মামলায় তাদের হয়রানি করছে।
তাদের অভিযোগ, ২০২৩ সালের ৯ অক্টোবর, প্রবাসী জিয়াউর রহমানের স্ত্রী রোজিনা বেগম বাদি হয়ে আলমগীর মণ্ডল, তার স্ত্রী মৌসুমি বেগম, দুই ভাইসহ ৯ জনকে আসামি করে সুন্দরগঞ্জ থানায় মামলা করেন। স্থানীয় চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে মামলাটির আপোষ-মিমাংসা হয়। যেখানে উপস্থিত থেকে আপোষনামায় স্বাক্ষর করেছিলেন সৌদিতে থাকা জামিউল ইসলামের বাবা আব্দুল মান্নানও। কিন্তু ওই আপোষের দীর্ঘ ৮ মাস পর আবারও আলমগীরসহ ১০ জনকে আসামি করে মামলা করে সৌদিতে থাকা জামিউল ইসলামের ভাই জাকারিয়া ইসলাম। একের পর এক এসব মিথ্যা মামলায় প্রবাসী আলমগীরের স্ত্রী মৌসুমি গ্রেফতার হয়ে শিশুসন্তানকে নিয়ে জেল হাজতে থাকাসহ এখনো পুলিশের ভয়ে অনেকে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। হয়রানিমূলক এসব মামলা থেকে বাঁচতে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করেও প্রতিকার মেলেনি বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী পারিবারের। আর মামলা অপোষের বিষয়টি স্বীকারও করেন জিয়াউরের স্ত্রী রোজিনা বেগম।
এদিকে, টাকা হাতিয়ে নেওয়া চক্রটি শুধু আলমগীরের পরিবার নয়, মানব পাচারের মিথ্যা গায়েবী মামলায় হয়রানি করেছে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার আরও অনেককে। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে পরান গ্রামের পল্লী চিকিৎসক নুরুন্নবী সরকার, রামজীবন ইউনিয়নের দক্ষিণ বেকাটারি গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য বাদশা মিয়া এবং রেজাউল করীম নামে এক কলেজ শিক্ষকের উপরেও একই কৌশলে মামলা ঠুকে দেওয়ার তথ্য।
তারা বলছেন, হঠাৎ করে মানব পাচার মামলায় জেল খেটে মান-সম্মান গেলেও কেউই চেনেন না মামলার বাদি-স্বাক্ষীসহ কোনো প্রবাসীকেও। এমন নাটকীয় মামলায় ফাঁসানোর জন্য তারা প্রবাসী সুমন ব্যাপারী, আনজু ও স্থানীয় এলাকার ফিটুকে দায়ী করছেন।

এলাকাবাসী বলছে, দীর্ঘদিন ধরে চক্রটি পারিবারিক দ্বন্ধের জের ধরেও গ্রামের নিরীহ মানুষদের বিরুদ্ধে মামলা এবং পরে আপোষের নাটক করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এভাবে একের পর এক মানবপাচারের মতো মিথ্যা মামলার ঘটনায় আতঙ্ক আর উদ্বেগ বাড়ছে স্থানীয়দের মাঝে। দ্রুত চক্রের সদস্যদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্ত শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।
এদিকে, অভিযোগের বিষয়ে জানতে দক্ষিণ ধুমাইটারি গ্রামের বাড়িতে গিয়েও পাওয়া যায়নি অভিযুক্ত মিঠু মিয়া ওরফে ফিটুকে। পরে মুঠফোনেও বিষয়টি এড়িয়ে যান তিনি। এছাড়া প্রবাসী সুমন ব্যাপারী ও আনজু মিয়ার সঙ্গে হোটসআপ ও ম্যাসেঞ্জারে যোগোযোগের চেষ্টা করলেও তারা সাড়া দেয়নি।
মানব পাচারের অভিযোগে হয়রানিমূলক মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে গাইবান্ধার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্ ) শরিফুল আলম বলেন, মানবপাচার খুব সেনসেটিভ একটি বিষয়। তাই এমন মামলাকে পুঁজি করে কোনো নিরপরাধ ও নিরীহ মানুষ যাতে হয়রানি এবং ক্ষতির স্বীকার না হন সে বিষয়ে আমরা সতর্ক রয়েছি।
Leave a Reply