রংপুর অফিস: বছর ঘুরে আসে বন্যা, তারপর খরা—কিন্তু বদলায় না তিস্তা পাড়ের মানুষের ভাগ্য। কখনো পানিতে ভাসে ঘরবাড়ি, কখনো বালুচরে হারিয়ে যায় জীবিকার শেষ সম্বল। এই চক্রের মধ্যেই জমে থাকে তিস্তা পাড়ের মানুষের চাপা কান্না।

প্রতি বছরই উজানের ঢলে ভাসে ঘরবাড়ি, তলিয়ে যায় ফসলের মাঠ। পরিবার-পরিজন আর গবাদিপশু নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে হয় হাজারো মানুষকে। তখন তিস্তার ডানতীর রক্ষা বাঁধই হয়ে ওঠে শেষ ভরসা। বালুচরে গড়ে ওঠা স্বপ্ন মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে বানের জলে।
এই ভাঙা-গড়ার জীবনই বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে তিস্তা পাড়ের মানুষের কাছে। না খেয়ে-খেয়ে, দুঃখ-কষ্ট বুকে নিয়েই বড় হচ্ছে এখানকার শিশুরা।

তিস্তা পাড়ের এমনই এক জনপদ নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার টেপা খড়িবাড়ি ইউনিয়ন। উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের এই ইউনিয়নকে মাঝ বরাবর কেটে গেছে খরস্রোতা তিস্তা নদী। নদীর দক্ষিণ পাড়ের মানুষ মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত থাকলেও উত্তর পাড়ের চারটি ওয়ার্ডের মানুষের দুর্ভোগ যেন অন্তহীন।
খরা, বন্যা আর নদীভাঙন এখানে নিত্যসঙ্গী। শুষ্ক মৌসুমে কিছুটা স্বস্তি মিললেও বর্ষা এলেই বাড়ির দুয়ারে পানি। কোথাও যেতে হলে বালুচর পেরিয়ে, নৌকায় নদী পার হয়ে আবার হাঁটতে হয় মাইলের পর মাইল।

স্থানীয় কলেজ শিক্ষক নজরুল ইসলাম বলেন, “তিস্তা পাড়ে জন্ম যেন আমাদের আজন্ম পাপ।” স্কুল শিক্ষিকা খাদিজা বেগমের ভাষায়, “এই কষ্ট বলে বোঝানো যাবে না—দেখতে হলে বানের সময় এখানে আসতে হবে।”
একই চিত্র শিক্ষার্থীদের জীবনেও। টেপা খড়িবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী সুমি আক্তার জানায়, কখনো তপ্ত বালুচর, কখনো জমির আইল, আবার কখনো নৌকায় করে স্কুলে যেতে হয়। বর্ষা এলেই বন্ধ হয়ে যায় পড়াশোনা।

সাধারণ সেবা পেতেও পোহাতে হয় দুর্ভোগ। ইউনিয়ন পরিষদে যেতে হলে পায়ে হেঁটে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে নদী পার হতে হয়। এতে একটি জন্মসনদ বা নাগরিক সনদ তুলতেই দিন শেষ হয়ে যায়।
স্থানীয়দের দাবি, তিস্তার উত্তর পাড়ের মানুষের জন্য পৃথক ইউনিয়ন পরিষদ গঠন করা হলে শিক্ষা, চিকিৎসা ও নাগরিক সেবা অনেকটাই সহজ হবে।
Leave a Reply