স্টাফ রিপোর্টার: রাজনীতির মাঠে প্রকাশ্যে হাঁকডাক যতই থাক না কেন, ক্ষমতাসীন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল কেউই আপাতত একে-অপরের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে না। তবে কৌশলগত কারণে উভয় পক্ষই পরস্পরকে রাজনৈতিক চাপে রাখার কৌশল অনুসরণ করবে। জামায়াত, এনসিপিসহ (জাতীয় নাগরিক পার্টি) বিরোধী পক্ষ সংস্কার, জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন ইস্যুতে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় থাকার পরিকল্পনা নিয়েছে। উদ্দেশ্য-একদিকে সরকারকে চাপের মুখে রেখে দাবি আদায় করা, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য জনমত গঠন করে তাদের পক্ষে নেওয়া। এ কারণেই ধারাবাহিক কর্মসূচির পথে হাঁটছে তারা।

ইতোমধ্যে ১১ দলীয় জোটের ব্যানারে মিছিল, সমাবেশসহ বেশকিছু কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। রাজধানীসহ সারা দেশের জেলা-উপজেলা পর্যায়ে আরও নানা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। একপর্যায়ে রাজধানী ঢাকায় মহাসমাবেশ কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়ে তাদের প্রথম ধাপের কর্মসূচি শেষ হতে পারে। তবে সামনে বর্ষাকাল থাকায় আন্দোলনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হবে না।
অন্যদিকে সরকার এবং সরকারি দলেরও পালটা কোনো কর্মসূচি নিয়ে আপাতত মাঠে নামার সম্ভাবনা নেই। বরং প্রশাসনিক ব্যবস্থার বদলে কঠোর রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে চাপ প্রয়োগের কৌশল নিয়েছে তারা। ইতোমধ্যে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের বক্তব্যে জামায়াত ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে ‘গুপ্ত’ সংগঠন হিসাবে অভিহিত করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দুদলের পাশাপাশি দেশের রাজনীতিতেও নানা বিতর্ক শুরু হয়েছে। এছাড়া স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা সামনে এনে দলটির ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। উদ্দেশ্য হলো, জামায়াত যাতে তাদের অতীতের কর্মকাণ্ড ভুলে না যায়। তবে দুপক্ষই তাদের সীমাবদ্ধতার কথা জানে বলে পর্যবেক্ষক মহলে আলোচনা আছে। বলা হচ্ছে, সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হলে তাতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ তৈরি হবে। আর এমন পরিস্থিতিতে বিপদ বাড়তে পারে বলে তিন দলের মধ্যেই আলোচনা আছে। বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ দেশেররাজনীতিতে ফিরে ফের ক্ষমতায় যেতে পারলে কাউকে ছাড় দেবে না। বরং বিএনপির তুলনায় জামায়াত ও এনসিপি আওয়ামী লীগের বড় শত্রু-এমন আলোচনা আছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজনীতিতে এসব আলোচনা ও পর্যালোচনার মুখে বিরোধীদের সরকার বোঝাতে চাইছে যে, অতিরিক্ত কঠোর আন্দোলনে গেলে দেশে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হতে পারে। তাছাড়া বিষয়টি বিরোধী দলের নেতারাও জানেন। সরকারের এমন কৌশলের উদ্দেশ্য হলো জামায়াতের সামনে দৃশ্যমান করা যে, তারা বেশি কঠোর অবস্থানে গেলে আওয়ামী লীগের ফেরার সুযোগ তৈরি হতে পারে। অনেকের মতে, তিন দলের মধ্যে আওয়ামী লীগের ব্যাপারে একধরনের ভীতিও রয়েছে। ফলে রাজনীতির মাঠে যতই কঠোর অবস্থান দেখা যাক না কেন, আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনা প্রশ্নে শেষ পর্যন্ত বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি ঐক্যবদ্ধ থাকবে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এ প্রসঙ্গে বলেন, মৌলিক বিষয়গুলোয় আমাদের ঐক্যের দরকার ছিল। কিন্তু আমাদের সরকারি দল ও বিরোধী দল কিছুটা মুখোমুখি অবস্থানে দেখা যাচ্ছে। তবে এখন কিছুটা জটিলতার মধ্যে থাকলেও পরিস্থিতি কী হয় বলা যায় না। কারণ, আওয়ামী লীগ ফিরে এলে কী হবে, সেই ভীতি সবারই আছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুইজন নেতা বলেন, জামায়াত ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতিহিংসার রাজনীতির পথে যাচ্ছে। দলটির বিগত সময়ের কর্মকাণ্ডও বির্তকিত। এখন আবার নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। এর মধ্য দিয়ে জামায়াত নেতারা ফ্যাসিবাদকে স্বাগত জানাতে চাচ্ছে। তবে জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সৃষ্ট সমস্যা গণতান্ত্রিকভাবেই মোকাবিলা করবে বিএনপি। বহুলপ্রত্যাশিত এদেশের হারানো গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে জনগণের সঙ্গে বিএনপি কাজ করছে। তারা বলেন, জামায়াত ইস্যুতে শনিবার বিএনপি মহাসচিব যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটি দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামে আগে আলোচনা হয়নি। তবে মহাসচিবের বক্তব্য যৌক্তিক। তিনি জামায়াতের কর্মকাণ্ডকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূল করার কথা বলেছেন। মির্জা ফখরুলের ওই বক্তব্য কোনো ‘প্রতিহিংসামূলক নয়’ বলেও দাবি করেন বিএনপি নেতারা।
এদিকে দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী রোববার শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কবরে শ্রদ্ধা জানানো শেষে সাংবাদিকদের বলেন, একটি গোষ্ঠী স্বাধীনতার ইতিহাস ভুলিয়ে দিতে চাচ্ছে। কিন্তু কোনো চক্রান্তই সফল হবে না। ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা কোনো চক্রান্তের মাধ্যমে মুছে ফেলা যাবে না।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব যোবায়ের রোববার বলেন, জুলাই সনদের বিষয়ে ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমরা পরপর তিন সপ্তাহের কর্মসূচি দিয়েছি। ২ মে সারা দেশে জেলা সদরে গণমিছিল হবে। এ কর্মসূচি শেষ হলে বিভাগীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। তিনি বলেন, ঈদের পর ঢাকায় বড় আকারের মহাসমাবেশ করার বিষয়েও চিন্তাভাবনা আছে। তবে তার আগে বিভিন্ন পর্যায়ে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, লিফলেট বিতরণের কর্মসূচি চলমান থাকবে। আমরা আশা করব, বড় ধরনের কর্মসূচি আসার আগেই সরকার গণভোটের রায় মেনে নেবে। সংসদেই আমরা এর সমাধান আশা করছি। তা যদি সরকার না মানে, তাহলে আমরা তো রাজপথে নেমেই আছি।

এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন, জুলাই সনদ, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড রোধে দেশবাসী সোচ্চার হচ্ছে। সরকারকে বাধ্য করা হবে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে। ১১ দলীয় জোটসহ রাজনৈতিক দলগুলো মাঠে রয়েছে। এবার আন্দোলনের ঝাঁজ বাড়াতে বৃহত্তর কর্মসূচি নেওয়া হবে। গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ফিরে আসা গণতন্ত্র রক্ষায় আবার মানুষ জীবন পর্যন্ত দেবে।
আসিফ মাহমুদ আরও বলেন, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলছেন, একটি রাজনৈতিক দলকে নির্মূল করে দেওয়া হবে। আবারও আওয়ামী লীগের ভাষায় তাদের মুখ থেকে এমন বক্তব্য শুনতে পাচ্ছি। তবে আমরা সাফ বলছি, যে কোনো পরিস্থিতিতে আমরা মাঠে আছি, মাঠে থাকব। তিনি বলেন, আমরা আন্দোলনের মধ্যেই আছি। ইতোমধ্যে সারা দেশেই আন্দোলনের কর্মসূচি হচ্ছে। চলমান সভা-সেমিনার সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়া হবে। সরকারি দলের হুমকি-ধমকিতে আমরা আগেও ভয় পাইনি, এখনো ভয় পাচ্ছি না।
১১ দলীয় ঐক্যের অন্যতম শরিক বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, সরকার যাদের রক্তের ওপর দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে তাদের কথাই এখন ভুলে গেছে। আমাদের আন্দোলন জনগণের জন্য। বিএনপি ‘হ্যাঁ’ ভোটের ম্যান্ডেট মেনে নিলে আমাদের রাজপথে আসার প্রয়োজন হতো না। তিনি বলেন, বিএনপিও আওয়ামী লীগের দ্বারা নির্যাতিত দল। অথচ ক্ষমতায় গিয়ে তারা তা ভুলে গিয়ে পতিত ফ্যাসিস্ট হাসিনার পথে হাঁটছে।

বুধবার জাতীয় সংসদে জ্বালানি সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে সরকার ও বিরোধী দল ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। পরদিন বৃহস্পতিবার সরকারি ও বিরোধী দলের পাঁচ সদস্য করে ১০ সদস্যের কমিটিও গঠন করা হয়। মঙ্গলবার এই কমিটির সভা রয়েছে। যদিও সংসদে একসঙ্গে কাজের অঙ্গীকারের পরও সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে সম্পর্কের যে অবণতি হয়েছে তার সর্বশেষ উদাহরণ দেখা গেছে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যে। শনিবার দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক যৌথ সভায় তিনি বলেছেন, ‘জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূল করতে হবে’।
অনেকেই মির্জা ফখরুলের বক্তব্যের তাৎপর্য খোঁজার চেষ্টা করেছেন। তবে রাজনৈতিক মহলে এ বক্তব্যের তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা হলেও বিএনপির একাধিক সূত্রের দাবি, এটিও মূলত চাপ সৃষ্টির কৌশল, সরাসরি সংঘাতের বার্তা নয়। এছাড়া স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইস্যুটিকেও সব সময় সামনে রাখবে তারা। অন্যদিকে ‘গুপ্ত’ শব্দ ব্যবহার করেও একধরনের ‘ন্যারেটিভ’ তৈরি করে চাপে রাখার কৌশল নেওয়া হয়েছে।

এদিকে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের এসব বক্তব্যের জবাবও কঠোরভাবে দিচ্ছেন বিরোধী দলের প্রভাবশালী নেতারাও। গত শুক্রবার বেলা ১১টায় ঝিনাইদহের জোহান ড্রিম ভ্যালি পার্কের অডিটোরিয়ামে জামায়াতের ওয়ার্ড সভাপতি সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, যারা ১৭ বছর দেশের বাইরে ছিল, তারাই গুপ্ত। অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক গুপ্ত উপদেষ্টা এখন এই সরকারের মন্ত্রী।
তবে রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় সংঘর্ষের সম্ভাবনা কম; বরং সামনে থাকবে অবস্থান জানানোর রাজনীতি। সব মিলিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আপাতত মুখোমুখি সংঘাতের চেয়ে নিয়ন্ত্রিত চাপ, পালটা চাপ এবং অবস্থান তৈরির রাজনীতিই বেশি প্রাধান্য পাবে বলে মনে করছেন তারা।
Leave a Reply