বিজ্ঞাপন:
সংবাদ শিরোনাম:
দেশের ইতিহাসে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি মজুদ রয়েছে: জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী গঙ্গাচড়ায় গলায় ফাঁস দিয়ে গৃহবধূর আত্মহত্যা রেলওয়ের সাবেক প্রকৌশলী রমজান আলীর দুর্নীতির পাহাড় : বরখাস্ত হলেও থামেনি তদন্ত স্ত্রীকে আনতে গিয়ে দুর্বৃত্তের হাতে খুন হন শফিকুল বুলবুল ফুলগাছ উচ্চ বিদ্যালয়ে,এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় ও নবীনবরণ উপলক্ষে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান পঞ্চগড়ে কলেজছাত্রীকে উত্যক্ত: যুবকের ১ বছরের কারাদণ্ড হাতীবান্ধায় পুলিশের মোটরসাইকেলের ধা’ক্কায় বৃদ্ধা মহিলা নি’হত দুর্ঘটনায় ‎মেরুদণ্ড ভেঙে শয্যাশায়ী দিনমজুর ছালাউদ্দিন, চরম মানবিক সংকটে পরিবার বিকেলে ছুটির পর সন্ধ্যায় তালাবদ্ধ স্কুলের বাথরুম থেকে উদ্ধার হলো শিশু গণভোটের রায় বাস্তবায়নে ১৫ দিনের কর্মসূচি দিলো জামায়াতসহ ১১ দল
এক দশকের বিতর্কে পিআইও নুরুন্নবী সরকার, বিভাগীয় শাস্তিও যেন কার্যহীন

এক দশকের বিতর্কে পিআইও নুরুন্নবী সরকার, বিভাগীয় শাস্তিও যেন কার্যহীন

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ থেকে সন্দ্বীপ, বাঘাইছড়ি, বান্দরবন, নাটোরের বাগাতিপাড়া, দিনাজপুরের হাকিমপুর, সুনামগঞ্জের শাল্লা হয়ে সর্বশেষ ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল—প্রায় এক দশক ধরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. নুরুন্নবী সরকারকে ঘিরে অভিযোগ, তদন্ত, বিভাগীয় শাস্তি ও আদালত-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া বারবার আলোচনায় এসেছে। বিষয়টি কেবল একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বিতর্ক নয়; বরং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা, তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগ কতটা ফলপ্রসূ—সেই মৌলিক প্রশ্নও সামনে এনেছে।

উপলব্ধ নথি, অভিযোগপত্র, বিভাগীয় মামলার আদেশ এবং আদালতের কার্যবিবরণী পর্যালোচনায় দেখা যায়—২০১৫ থেকে ২০২৫ সময়কালে তার বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়ম, অসদাচরণ ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিভাগীয় মামলা, বেতন গ্রেড হ্রাস, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত, সাময়িক বরখাস্ত এবং একাধিক বদলির মতো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবুও সামগ্রিকভাবে এসব পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হয়েছে—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।

সুন্দরগঞ্জ অধ্যায় (২০১৫–২০১৯) অভিযোগের সূত্রপাত যেভাবে : ২০১৫ সালে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় পিআইও হিসেবে যোগদানের পর টিআর, কাবিটা ও কর্মসৃজন প্রকল্প বাস্তবায়ন ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের মধ্যে ছিল—কাজ বাস্তবায়ন ছাড়াই বিল উত্তোলন, ত্রাণ সামগ্রী বিতরণে অনিয়ম, ঘুষ দাবি এবং সহকর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণ। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে স্থানীয় পর্যায়ে মানববন্ধন, লিখিত আবেদন ও প্রশাসনিক তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

২০১৯ সালের ৭ সেপ্টেম্বর যমুনা টেলিভিশন-এ একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রচারের পর বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ে আলোচিত হয়। পরবর্তীতে কালের কণ্ঠসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তদন্তে অনিয়মের প্রমাণের ভিত্তিতে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের তথ্য নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

বিভাগীয় মামলা নং ০৫/২০২০-এ মিথ্যা ভ্রমণ ভাতা উত্তোলন ও অসদাচরণের অভিযোগে তার বেতন গ্রেড কমিয়ে ১০ম গ্রেডের সর্বনিম্ন ধাপে নামানো হয়। মামলা নং ১১/২০২১-এ দুই বছরের বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত এবং সাময়িক বরখাস্তের আদেশ দেওয়া হয়। তবে পরবর্তী প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় তিনি পুনরায় দায়িত্বে বহাল থাকেন।

বাঘাইছড়ি (রাঙ্গামাটি): ঘুষের অভিযোগ ও প্রশাসনিক বিরোধ যোগদানের পর থেকেই। তার বিরুদ্ধে প্রকল্প অনুমোদন ও বিল ছাড় প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। উপজেলা চেয়ারম্যান ও একাধিক ইউপি সদস্য আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বিষয়টি উত্থাপন করেন। অভিযোগের মধ্যে ছিল—কাজের অনুমোদনে অস্বচ্ছতা, কমিশন দাবি এবং জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার।

পরিস্থিতি ক্রমে উত্তপ্ত হয়ে উঠলে প্রশাসনিক পর্যায়ে তার বদলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর বিষয়ে আনুষ্ঠানিক চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি; তবে নথিভুক্ত আপত্তি ও সভার কার্যবিবরণীতে বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছে বলে জানা যায়।

বাগাতিপাড়া (নাটোর) উপজেলায় অফিস ফাঁকি ও বিভাগীয় মামলা হয় নুরুন্নবী সরকারের বিরুদ্ধে।বাগাতিপাড়ায় দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে নিয়মিত অফিসে অনুপস্থিতি, সহকর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণ এবং ছুটির শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিন দিনের ছুটি নিয়ে তিনি ১৩ দিন অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন।

এ ঘটনায় বিভাগীয় মামলা নং ৩৪/২২ দায়ের হয়। সংশ্লিষ্ট ইউএনও ও উপজেলা চেয়ারম্যান লিখিতভাবে তার বদলির সুপারিশ করেন। প্রশাসনিক তদন্তের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় প্রক্রিয়া শুরু হয়।

হাকিমপুর (দিনাজপুর) উপজেলাতেও বিল জটিলতা ও হুমকির অভিযোগ উঠে। হাকিমপুরে প্রায় ১১ মাসের কর্মকালেও প্রকল্প বিল প্রক্রিয়া ও কাগজপত্র নিয়ে জটিলতার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বরাদ্দ ও কাজের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তুললে “দেখে নেওয়া হবে” ধরনের হুমকিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ উত্থাপিত হয়।

মাঠপর্যায়ে সমন্বয়হীনতা ও বিলম্বের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যাহত হয়েছে—এমন অভিযোগ উপজেলা প্রশাসনের নজরে আনা হয়। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশাসনিক অনুসন্ধান হয়েছে কি না, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশিত হয়নি।

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা ও আদালত প্রক্রিয়ায় নুরুন্নবী সরকার ২০১৯ সালের ১৫ অক্টোবর রংপুর আদালতে সাংবাদিক ও গণমাধ্যম-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে মানহানির দুটি মামলা দায়ের করেন। এতে যমুনা টেলিভিশন-এর প্রধান নির্বাহী এবং কালের কণ্ঠ-এর সম্পাদকসহ ১২ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। মামলাগুলোর তদন্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দীর্ঘ চার বছর বিচার প্রক্রিয়া চলার পর ২০২৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি আদালত অভিযোগ খারিজ করেন।

মামলা চলাকালে ২ আগস্ট ২০২২ সালে রংপুর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণে হাজিরা দিতে আসা সাংবাদিকদের উদ্দেশে প্রকাশ্যে হুমকি দেন নুরুন্নবী সরকার। হুমকির অভিযোগে কোতোয়ালি থানায় জিডি (নং ৩৭৭) দায়ের করেন সাংবাদিকরা। পরে আদালতের নির্দেশে পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে জানা যায়। মামলাটি বর্তমানে নন-এফআইআর/এনজিআর হিসেবে বিচারাধীন এবং সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।

এরআগে তিনি সুনামগঞ্জের শাল্লায় দায়িত্ব পালনকালে একাধিক প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ২০২৫ সালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনায় ১৪টি প্রকল্পে আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। দুদকের গণশুনানিতে হাজিরা অমান্য ও স্থায়ী বরখাস্তের সুপারিশের বিষয়টিও আলোচিত হয়। পরবর্তীতে তাকে প্রধান কার্যালয়ে বদলি ও সংযুক্ত করা হয়।

সর্বশেষ ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈলে দায়িত্ব পালনকালে স্থানীয় এক ইউপি সদস্যকে প্রকাশ্যে “দেখে নেওয়া হবে” বলে হুমকির অভিযোগ উঠে। এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। তবে এ বিষয়ে প্রশাসনিক তদন্ত বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো পাওয়া যায়নি।

সম্পদ ও আর্থিক অনুসন্ধান প্রসঙ্গে তার বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে তার ব্যক্তিগত সম্পদ ও সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। কুড়িগ্রাম ও রংপুরে স্থাবর সম্পত্তি সংক্রান্ত তথ্য স্থানীয়ভাবে আলোচিত হলেও এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান ছাড়া এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

এক দশকের সমন্বিত মূল্যায়ন: ব্যক্তি নয়, প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্নে নুরুন্নবী সরকারের বিরুদ্ধে নানা দুর্নীতি-অপকর্মের অভিযোগ বেশ আলোচিত। ২০১৫–২০২৫ সময়কালের নথিভিত্তিক চিত্রে দেখা যায়—একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ, কমপক্ষে পাঁচটি বিভাগীয় মামলা, বেতন গ্রেড হ্রাস, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত, সাময়িক বরখাস্ত এবং একাধিক বদলির ঘটনা ঘটেছে। তবুও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বিভিন্ন কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রেখেছেন।

এই ধারাবাহিকতা একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে—বিভাগীয় শাস্তি, বদলি ও তদন্ত প্রক্রিয়া কি বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারছে? প্রশাসনিক তদারকি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কার্যকারিতা কতটা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত?

চূড়ান্ত সত্য নির্ধারণের দায়িত্ব আদালত ও সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার। তবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও সময়োপযোগী অনুসন্ধান—এবং তার ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ—সুশাসনের অপরিহার্য শর্ত।

রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে আইনের সমান প্রয়োগ, প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং তদন্তের ফলাফলের স্বচ্ছ প্রকাশ—এগুলো কেবল নীতিগত প্রতিশ্রুতি নয়; এগুলো নাগরিক আস্থার ভিত্তি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দৃশ্যমান শাস্তি, আর প্রমাণিত না হলে স্পষ্ট অব্যাহতি—উভয় ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত হওয়াই রাষ্ট্র ও প্রশাসনের প্রতি নাগরিক প্রত্যাশা।

লেখক: জিল্লুর রহমান পলাশ
গণমাধ্যমকর্মী, গাইবান্ধা

(মুক্তমতামত বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

আরইসআর/প্রবা


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ওয়েবসাইট এর কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি।
Design & Development BY : ThemeNeed.com