অদ্ভুত এক নিয়তি—যে মানুষটি জন্ম নিয়েছিলেন ৬ জুনে, তাঁর বিদায়ের সময়ও এসে থামে একই সংখ্যার স্মৃতিবাহী অধ্যায়ে। যেন জন্ম আর বিদায়ের মাঝখানে বিস্তৃত পুরো জীবনটাই হয়ে ওঠে সততা, সংগ্রাম, শিক্ষা, মানবিকতা ও আত্মমর্যাদার এক উজ্জ্বল ইতিহাস।

আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর কর্ম, আদর্শ, সততা, ত্যাগ ও মানুষের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা বেঁচে থাকবে অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে।
“তোতা মাস্টার” থেকে “তোতা উকিল”—এটি কেবল একটি নামের গল্প নয়; এটি এক আলোকিত, সংগ্রামী, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও মানবিক জীবনের অনন্য ইতিহাস।
কেউ শিক্ষক হয়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেন, কেউ আইনজীবী হয়ে ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়ান, আবার কেউ সমাজসেবার মাধ্যমে হয়ে ওঠেন মানুষের আস্থার প্রতীক। কিন্তু খুব কম মানুষই আছেন, যাঁরা জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে সততা, আদর্শ, সংগ্রাম আর মানবিকতার স্বাক্ষর রেখে যান। অ্যাডভোকেট মো. জহুরুল ইসলাম মণ্ডল ছিলেন তেমনই একজন মানুষ—যিনি মানুষের কাছে পরিচিত ছিলেন “তোতা মাস্টার” ও পরে “তোতা উকিল” নামে।

১৯৪৫ সালের ৬ জুন গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার দক্ষিণ জামুডাঙ্গা গ্রামের ঐতিহ্যবাহী মণ্ডল পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মানুষটির জীবন ছিল সংগ্রাম, আত্মমর্যাদা ও নীতির এক অনন্য উপাখ্যান। সীমিত সামর্থ্য, কঠিন বাস্তবতা, অভাব আর প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েই তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন শিক্ষা, পরিশ্রম ও সততার শক্তিতে।
ছাত্রজীবনে পায়ে হেঁটে সাদুল্লাপুর শহরে পড়তে যেতেন। পরে সাইকেলে করে শিক্ষকতা করেছেন। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে মোটরসাইকেল তাঁর সঙ্গী হলেও জীবনজুড়ে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ, সাদাসিধে ও আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন একজন মানুষ। সৎ উপার্জন আর নীতিকে তিনি কখনও বিসর্জন দেননি। বিলাসিতা তাঁর জীবনের অংশ ছিল না।
“তোতা মাস্টার” থেকে “তোতা উকিল” হয়ে ওঠার গল্প:
কর্মজীবনের শুরু শিক্ষকতা দিয়ে। সেই সূত্রেই এলাকাজুড়ে পরিচিত হয়ে ওঠেন “তোতা মাস্টার” নামে। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন শিক্ষা বিস্তারের মহৎ কাজে।

তিনি বিশ্বাস করতেন—একটি জাতি কিংবা সমাজকে আলোকিত করতে হলে শিক্ষার বিকল্প নেই। সেই বিশ্বাস থেকেই প্রতিষ্ঠা করেন নিয়াতনগর উচ্চ বিদ্যালয়। পরে ১৯৯৪ সালে নিজ গ্রামে গড়ে তোলেন জামুডাঙ্গা আদর্শ দ্বিমুখী দাখিল মাদ্রাসা। দীর্ঘ সংগ্রাম, দৌড়ঝাঁপ ও প্রতিকূলতা পেরিয়ে ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত হয়। শিক্ষা বিস্তারে তাঁর এই অবদান আজও স্থানীয় মানুষের মুখে শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়।
১৯৯৩ সালে আইন পেশায় যোগ দিয়ে তিনি নতুন পরিচয়ে পরিচিত হন—“তোতা উকিল” নামে। গাইবান্ধা আদালতে একজন সিনিয়র আইনজীবী হিসেবে তিনি শুধু মামলা পরিচালনাই করেননি; সততা, ন্যায়বোধ, স্পষ্টভাষিতা ও মানবিকতার মাধ্যমে মানুষের আস্থা ও শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন।
মানুষের জন্য নিবেদিত এক নিরহংকার জীবন:
বাবা ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে, স্পষ্টভাষী, নীতিবান ও নিরহংকার মানুষ। ধনী-গরিব, ছোট-বড়—সবাই ছিল তাঁর কাছে সমান। মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাইতে পারার বিরল গুণ তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

মানুষের কল্যাণে কাজ করার স্বপ্ন থেকেই ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পদে একাধিকবার নির্বাচন করেছিলেন। নির্বাচনে জয়ী না হলেও মানুষের হৃদয়ে নিজের জায়গা কখনও হারাননি। জনপ্রতিনিধি না হয়েও এলাকার উন্নয়ন, রাস্তাঘাট নির্মাণ ও মানুষের চলাচলের সুবিধার জন্য নিজ হাতে কাজ করেছেন।
একসময় গ্রামের রাস্তাঘাট ছিল কাদামাটিতে ভরা। মানুষের চলাচল ছিল অত্যন্ত দুর্ভোগপূর্ণ। সেই রাস্তা নিজ হাতে কোদাল চালিয়ে বড় করেছেন তিনি। কারণ মানুষের কষ্ট তিনি সহ্য করতে পারতেন না।
বাবার আদর্শেই বেড়ে ওঠা আমার জীবন:
আমরা পাঁচ বোন ও আমি—একমাত্র ছেলে সন্তান। ছোটবেলা থেকেই বাবার কাছ থেকে পেয়েছি সীমাহীন ভালোবাসা, স্নেহ, আস্থা ও স্বাধীনতা। তিনি কখনও নিজের সিদ্ধান্ত আমাদের ওপর চাপিয়ে দেননি; বরং শিখিয়েছেন—সততা, আত্মসম্মান ও নীতি নিয়েই মানুষকে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয়।
বাবার প্রতিটি কর্মকাণ্ড, সিদ্ধান্ত ও জীবনদর্শন খুব কাছ থেকে দেখেছি। তাঁর মতো করেই নিজেকে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছি সবসময়।
স্কুলজীবন থেকেই সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি। মানুষের কথা বলা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লেখা আর সত্য প্রকাশের নেশা আমাকে প্রবলভাবে টানত। তবে বাবা শুরুতে সাংবাদিকতা পেশাকে খুব একটা পছন্দ করতেন না।
আমি বাবাকে বলেছিলাম—সাংবাদিকতাই হবে আমার পেশা, আমার নেশা, আমার পরিচয়। আদালতের বাররুম কিংবা আইন পেশার প্রতি খুব বেশি আগ্রহ না থাকলেও বাবার ইচ্ছার প্রতি সম্মান রেখেই মাস্টার্স শেষ করে এলএলবিতে ভর্তি হই এবং ২০১৩ সালে এলএলবি পাস করি।
২০১৭ সালে জীবনে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা তৈরি হয়—বাবা তখন সিনিয়র আইনজীবী, আর আমি শিক্ষানবিশ আইনজীবী। বাবার পাশে বসে আদালতের পরিবেশ, মানুষের শ্রদ্ধা, তাঁর ব্যক্তিত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা খুব কাছ থেকে দেখেছি। কিন্তু সত্যি বলতে, আইন পেশার চেয়ে কলম আর সংবাদজগতই আমাকে বেশি টেনেছে।

২০১৯ ও ২০২২ সালে বার কাউন্সিলের এনরোলমেন্ট পরীক্ষাও দিয়েছি। তবে পাস করতে পারিনি। হয়তো ভেতর থেকে খুব প্রবলভাবে সনদের প্রতি আকাঙ্ক্ষাও কাজ করেনি। কারণ আমি বিশ্বাস করি—বাবা যেমন “তোতা মাস্টার” থেকে “তোতা উকিল” হয়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন, আমিও হয়তো সাংবাদিক হিসেবেই মানুষের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করে যাচ্ছি।
সাংবাদিকতা আমার কাছে শুধু একটি পেশা নয়; এটি সত্য, সাহস, নীতি ও দায়িত্ববোধের জায়গা। তবে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাবাই আমার সবচেয়ে বড় অনুকরণীয় মানুষ। তাঁর আদর্শ, ব্যক্তিত্ব, নৈতিকতা, মানবিকতা ও আত্মমর্যাদাবোধ নিজের ভেতরে ধারণ করার চেষ্টা করেছি সবসময়।
দীর্ঘ অসুস্থতা আর শেষ সময়ের লড়াই:
জীবনের দীর্ঘ সময় সুস্থ থাকলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অ্যাজমা, শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ, কিডনি ও ফুসফুসজনিত নানা জটিলতায় আক্রান্ত হন বাবা।
২০১৯ সালে করোনাকালের শুরুতেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কয়েকদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। করোনা নেগেটিভ আসার পর জোর করেই বাড়ি ফিরে আসেন। ওষুধের চেয়ে তাঁর মানসিক শক্তিই ছিল সবচেয়ে বড় ভরসা।
২০২১ সালের পর থেকে শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হতে থাকে। ২০২২ সালে স্ট্রোক করার পর হাঁটার শক্তি হারিয়ে ফেলেন। তবুও মাঝেমধ্যে আমার কাঁধে ভর দিয়ে আদালতে যেতেন, নিজের চেয়ারে বসতেন। সেই দৃশ্য আজও চোখে ভাসে।
গত পাঁচ-ছয় বছর বাবাকে ঘিরেই ছিল আমাদের পুরো জীবন। চিকিৎসা, হাসপাতাল, ওষুধ আর দৌড়ঝাঁপের মধ্যেও আমরা সবসময় চেষ্টা করেছি তাঁকে আগলে রাখতে। আমার স্ত্রী, দুই মেয়ে, বোনেরা, ভাগ্নে-ভাগ্নিরা—সবাই ছিলেন তাঁর অত্যন্ত আদরের। বিশেষ করে ব্যাংকার আঙ্কেল, জেলি আপা ও ভাগ্নে সামির দিন-রাত তাঁর সেবায় নিবেদিত ছিলেন।
৬ মে: আমাদের জীবনের সবচেয়ে শূন্য সকাল:
৫ মে সকাল থেকে হঠাৎ করেই বাবার শারীরিক অবস্থার অবনতি শুরু হয়। সন্ধ্যার পর তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সারারাত চিকিৎসা চললেও তিনি আর কথা বলতে পারেননি। শুধু গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন আমাদের দিকে।
৬ মে সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে চিকিৎসকরা দ্রুত রংপুর মেডিকেলে নেওয়ার পরামর্শ দেন। তখন আমি বাবার ডান হাত ধরে ছিলাম। পাশে ছোট ফুপু তাঁকে ডাকছিলেন। মনে হচ্ছিল—সব শুনছেন, সব বুঝছেন, কিন্তু আর উত্তর দিতে পারছেন না।
একসময় বাবার হাত ধীরে নিস্তেজ হয়ে এলো। চোখ দুটো নীরবে বন্ধ হয়ে গেল। সকাল ১০টা ৫ মিনিটে আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় শূন্যতা তৈরি করে বাবা চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
নিজের কবর নিজেই তৈরি করেছিলেন বাবা:
বাবা ছিলেন অত্যন্ত ধর্মভীরু, নিয়মতান্ত্রিক ও পরকালমুখী মানুষ। নিয়মিত নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত ও ধর্মীয় অধ্যয়ন ছিল তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

সেই ভাবনা থেকেই ২০২০ সালের শেষদিকে বাড়ির উঠানের পশ্চিম পাশে নিজের কবর নিজেই প্রস্তুত করেছিলেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল—মাও যেন পাশে থাকেন। তাই দুজনের জন্যই কবরের চারপাশ পাকা করে রেখেছিলেন।
আজ সেই উঠানের কবরেই শায়িত আছেন তিনি। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা খেজুর গাছটি যেন তাঁর স্মৃতির নীরব প্রহরী হয়ে আছে।
শেষ বিদায়ে প্রকৃতিরও যেন নীরব অশ্রু:
শেষ বিদায়ের দিন সকাল থেকে আকাশজুড়ে ছিল রোদ, মেঘ আর বৃষ্টির অদ্ভুত মিশেল। বাবাকে বাড়িতে আনার পর দুপুর থেকেই শুরু হয় টানা বৃষ্টি। বাদ আসর জানাজার আগ পর্যন্ত টুপটাপ বৃষ্টি পড়ছিল। তবুও দূর-দূরান্ত থেকে আত্মীয়-স্বজন, শুভানুধ্যায়ী ও মুসল্লিরা ছুটে এসেছিলেন শেষ শ্রদ্ধা জানাতে।
জানাজা শেষে বাবাকে যখন কবরে শায়িত করা হলো, মোনাজাত শেষ হতেই পশ্চিম আকাশে সূর্যের আলো ফুটে ওঠে। মনে হচ্ছিল—একজন আলোকিত মানুষের বিদায়ে প্রকৃতিও যেন নীরবে শ্রদ্ধা জানাচ্ছে।
স্মৃতির ভেতর আজও বেঁচে আছেন বাবা:
আজ বাড়ি ভরা মানুষ, কিন্তু বাবা নেই। তাঁর ঘর আছে, বিছানা আছে, পরিচিত কণ্ঠের স্মৃতি আছে—শুধু মানুষটি নেই।

কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দোয়া করতে গিয়ে মনে হচ্ছিল—তিনি শুধু আমার বাবা নন; তিনি ছিলেন আমার সাহস, আশ্রয়, শক্তি ও পুরো পৃথিবী। বুকভাঙা কান্না থামাতে পারিনি। আমাকে ভেঙে পড়তে দেখে মা, বোন—সবাই কেঁদে ওঠেন। তখন নিজেকেই শক্ত করার চেষ্টা করেছি।
আজ বুঝতে পারি, একজন মানুষ পদ-পদবি বা সম্পদ দিয়ে বড় হন না। সততা, ত্যাগ, নীতি, মানবিকতা আর মানুষের ভালোবাসাই একজন মানুষকে সত্যিকারের সম্মানের জায়গায় পৌঁছে দেয়। বাবা তাঁর পুরো জীবন দিয়ে সেই শিক্ষাই দিয়ে গেছেন।
তিনি হয়তো শত বছর বাঁচেননি, কিন্তু তাঁর কর্ম, আদর্শ ও স্মৃতিগুলো বহু বছর মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে।
আমরা সবাই তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। আল্লাহ তাআলা যেন তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন।
বাবা, তুমি চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে আমাদের হৃদয়ের গভীরে।
— জিল্লুর রহমান পলাশ
জেলা প্রতিনিধি, যমুনা টেলিভিশন ও বাংলা ট্রিবিউন
সাধারণ সম্পাদক, সাদুল্লাপুর প্রেসক্লাব,গাইবান্ধা
Leave a Reply