কেস স্টাডি-১, প্রথম খণ্ড: অনুসন্ধান ও আইনী বিশ্লেষণে চাঞ্চল্যকর তথ্য
জিল্লুর রহমান পলাশ: ভূমি আইনের শাশ্বত নীতি হলো—‘দলিল যার, জমি তার’। কিন্তু যখন কড়া-গণ্ডা-ছটাকের মারপ্যাঁচে ১৫ শতকের দলিলকে জাদুকরী উপায়ে ২১ শতক বানিয়ে ফেলা হয়, তখন তাকে আর ‘ভুল’ বলা চলে না; তা হয়ে দাঁড়ায় একটি সুপরিকল্পিত ‘গাণিতিক জালিয়াতি’ (Arithmetic Fraud)। বিজ্ঞ সিনিয়র সহকারী জজ আদালত, সাদুল্লাপুর, গাইবান্ধায় বিচারাধীন ৫২/০৪ নং বাটোয়ারা মামলার আরজি ও নথিপত্র বিশ্লেষণে এমনই এক চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির চিত্রনাট্য বেরিয়ে এসেছে।

নালিশী জমির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস :
মৌজা-সাদুল্লাপুর, জে.এল নং ৪১, সিএস খতিয়ান নং ৩০৩, সাবেক দাগ ৫২৬, মোট জমি ২৪ শতক। এই ২৪ শতকের মধ্যে বিবাদী পক্ষ (লেখক) পত্তন ও দখল মূলে ০৮ শতক জমির প্রকৃত মালিক। পক্ষান্তরে, বাদীপক্ষের দালিলিক মালিকানা সর্বোচ্চ ১৫.৫৬ শতকের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
জালিয়াতির ১০টি শক্তিশালী আইনী ও গাণিতিক ব্যবচ্ছেদ :
১. গাণিতিক প্রতারণা (Arithmetic Fraud): বাদীরা আরজিতে দাবি করেছেন যে ২ কাঠা ২ ছটাক ১০ গণ্ডা জমি মানে ৯ শতক। অথচ সরকারি স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী এর পরিমাণ মাত্র ৩.৫৬ শতক। ৩.৫৬ শতককে ৯ শতক বানানো স্রেফ ভুল নয়, বরং এটি একটি দালিলিক জালিয়াতি।
২. কাল্পনিক যোগফল ও কারসাজি: বাদীরা তাদের ৩.৫৬ শতকের দলিলকে ৯ শতক লিখে তার সাথে অপর দলিলের ১২ শতক যোগ করে ৯+১২ = ২১ শতকের এক কাল্পনিক যোগফল তৈরি করেছেন। ১৫.৫৬ শতককে ২১ শতক বানানোই ছিল আমাদের ৫ শতক জমি গ্রাস করার মূল ফন্দি।
৩. এস.এ ২৯১ খতিয়ানের স্ববিরোধিতা: খতিয়ানে এই ৬ জন মালিকের মোট অংশ বা হিস্যা উল্লেখ আছে মাত্র ০.৫০ (অর্থাৎ ৮ আনা)। ১৬ আনা মালিকানার জন্য অংশ ১.০০০ হওয়া আবশ্যক। তারা খতিয়ানের অর্ধেক অংশকে জালিয়াতির মাধ্যমে পূর্ণ ২১ শতক দাবি করছে।

৪. ‘কোর্ফা’ স্বত্বের সীমাবদ্ধতা: খতিয়ানে বাদীদের নাম ‘কোর্ফা’ বা উপ-প্রজা হিসেবে নথিভুক্ত। আইন অনুযায়ী, কোর্ফা দখলদার কখনো মূল দলিলের সীমানা এবং দালিলিক পরিমাণের বাইরে এক ইঞ্চি জমিও দাবি করতে পারে না।
৫. ৬ জন মালিক বনাম ৪ ভাইয়ের কাল্পনিক বণ্টন: বাদীরা ৪ ভাইয়ের ৫.২৫ শতক করে ২১ শতকের যে ‘নাটকীয় বণ্টন’ দেখিয়েছেন, খতিয়ানে সেই অনুপাত বা নামের ধারাবাহিকতা নেই। এটি স্রেফ বিবাদী পক্ষের ৫ শতক জমি আত্মসাৎ করার জন্য তৈরি করা একটি বানোয়াট চিত্রনাট্য।
৬. শতবর্ষের নিরবচ্ছিন্ন আদি দখল: বিবাদী পক্ষ ১৯৩৬ সাল থেকে জোট জমিদারের নিকট থেকে ৩ শতক পত্তন এবং খাজনা পরিশোধ সাপেক্ষে ৫ শতকসহ মোট ০৮ শতক জমিতে শত বছর ধরে শান্তিপূর্ণ বসবাস ও ব্যবসা পরিচালনা করছে।
৭. ঐতিহাসিক খাজনা রশিদের গুরুত্ব: আমাদের কাছে ১৩৪৬ থেকে ১৩৬০ বাংলা সনের ধারাবাহিক খাজনা রশিদ রয়েছে, যা প্রমাণ করে এই ০৮ শতক জমি শুরু থেকেই বাদীদের দালিলিক সীমানার বাইরে আমাদের বৈধ এখতিয়ারে।
৮. কমিশন রিপোর্টের অকাট্য প্রমাণ: আদালতে দাখিলকৃত কমিশন রিপোর্টে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, বিবাদী পক্ষ পৃথকভাবে ৮ শতক জমিতে স্থাপনা ও সীমানা প্রাচীর নিয়ে দখলে আছে। যেখানে দখল ও খাজনা পরিশোধের ইতিহাস রয়েছে, সেখানে বাদীদের কাল্পনিক খতিয়ান মূল্যহীন।
৯. ২২ বছরের দীর্ঘ ভোগান্তি ও হয়রানি: ২০০৪ সালে দায়ের করা এই ভিত্তিহীন মামলার কারণে একটি পরিবার আজ ২২ বছর ধরে আদালতের বারান্দায় হয়রানির শিকার। আরজি দৃষ্টেই প্রমাণিত হয় যে, বাদীরা কড়া-গণ্ডার হিসাবে কারসাজি করে আদালতের মূল্যবান সময় নষ্ট করছে।

১০. আত্মসাতের হীন উদ্দেশ্য: সার্বিক পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, বিবাদীদের ২১ শতকের দাবি মূলত বিবাদী পক্ষের বৈধ ৫ শতক জমি ‘গিলে ফেলার’ একটি আইনী চক্রান্ত। দলিল কম থাকা সত্ত্বেও যোগফলে কারসাজি করা এই মামলার মূল ভিত্তিহীনতাকে প্রমাণ করে।
উপসংহার:
মুখে নয়, বরং বাদীদের দাখিলকৃত নথিপত্রের ব্যবচ্ছেদ করলেই এই জালিয়াতি উন্মোচিত হয়। সত্যের জয় নিশ্চিত করতে এবং পরসম্পদ গ্রাসকারীদের উপযুক্ত শিক্ষা দিতে এই জালিয়াতিপূর্ণ ৫২/০৪ নং মামলাটি অবিলম্বে খারিজ করার দাবি জানাই।
(বিজ্ঞ সিনিয়র সহকারী জজ আদালত, সাদুল্লাপুর, গাইবান্ধা; বাদী জোবেদা বেওয়া-আব্দুল করীম গংদের দায়ের করা ৫২/০৪ নং বাটোয়ারা মামলার নেপথ্যে, আরজি দৃষ্টে ও নথিপত্রের সত্যতাকে মিলিয়ে গাণিতিক কারসাজি জালিয়াতির চিত্রনাট্যের মুখোশ উন্মোচন! আর বিবাদী পক্ষের এক ভুক্তভোগী নাগরিক এবং পেশাগত ভাবে সাংবাদিকতায় যুক্ত থাকায় অনুসন্ধান পর্যবেক্ষণ, তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা এবং আইনী বিশ্লেষণে আমার এ লেখা।)
জিল্লুর রহমান পলাশ,
গণমাধ্যমকর্মী, এম.এ (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), এলএলবি; শিক্ষানবিশ আইনজীবী, গাইবান্ধা।
(মুক্তমতামত বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
Leave a Reply