বিজ্ঞাপন:
সংবাদ শিরোনাম:
নিত্যপণ্যের দাম বাড়তি, অস্বস্তিতে নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা গরমে হাঁসফাঁস করছে মানুষ, লোডশেডিং অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনতায় জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূলে কাজ করতে হবে : মির্জা ফখরুল প্ল্যাটফর্মে ঘুমিয়ে তারা, জেগে আছি আমরা— কারা সত্যিকারের শান্তিতে? পাম্পে ফুয়েল কার্ড চেক করার সময় ইউএনও’র ওপর হামলা, আহত বডিগার্ড এসএসসির প্রশ্ন দেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার ৪ ক্যান্সার আক্রান্ত মাকে বাঁচাতে আকুতি ঢাবি শিক্ষার্থী সজলের! ফুটপাতে জেনেশুনেই ‘বিষ’ খাচ্ছেন সবাই খাদ্যসংকটে থাকা শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা, সারা দেশে সতর্কতা জোরদার
প্রাথমিক বৃত্তিতে ৮০–২০% কোটা: মেধার স্বীকৃতি নাকি শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন বৈষম্যের সূচনা?

প্রাথমিক বৃত্তিতে ৮০–২০% কোটা: মেধার স্বীকৃতি নাকি শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন বৈষম্যের সূচনা?

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় বৃত্তি পরীক্ষা দীর্ঘদিন ধরেই মেধাবী শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। একটি শিশুর জন্য বৃত্তি পাওয়া শুধু আর্থিক সহায়তা নয়; এটি তার পরিশ্রমের স্বীকৃতি, আত্মবিশ্বাসের উৎস এবং ভবিষ্যৎ পথচলার একটি বড় প্রেরণা। তাই প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার মতো একটি ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার, সমতা এবং মেধাভিত্তিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ৮০ শতাংশ এবং কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য মাত্র ২০ শতাংশ কোটা নির্ধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় একটি নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার প্রশাসনিক কাঠামো পরিচালিত হয় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর–এর মাধ্যমে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি—এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারে সরকারি বিদ্যালয়গুলোর অবদানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একইসঙ্গে এটিও সত্য যে গত কয়েক দশকে কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোও শিক্ষাক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে আসছে।

অনেক এলাকায় সরকারি বিদ্যালয়ের সীমাবদ্ধতা, অবকাঠামোগত সমস্যা কিংবা শিক্ষক সংকটের কারণে অভিভাবকেরা সন্তানদের কিন্ডারগার্টেন বা বেসরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি করান। আবার অনেক ক্ষেত্রে তারা মনে করেন, এসব বিদ্যালয়ে পাঠদানের পরিবেশ তুলনামূলকভাবে উন্নত। ফলে দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এই ধরনের প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে এবং তারাও একই জাতীয় পাঠ্যক্রম অনুসরণ করছে।


এই বাস্তবতার মধ্যে বৃত্তির ক্ষেত্রে যদি প্রতিষ্ঠানভিত্তিকভাবে ৮০–২০ ভাগ নির্ধারণ করা হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—এটি কি সত্যিই মেধার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন নিশ্চিত করছে?
বৃত্তির মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মেধাবী শিক্ষার্থীদের স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাদের ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনে উৎসাহিত করা। কিন্তু যখন আগে থেকেই নির্ধারণ করে দেওয়া হয় যে অধিকাংশ বৃত্তি একটি নির্দিষ্ট ধরনের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাই পাবে, তখন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রটি আর সমান থাকে না। এতে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে যেখানে একজন শিক্ষার্থী তার মেধা ও পরিশ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হয়—শুধুমাত্র সে কোন ধরনের বিদ্যালয়ে পড়ছে তার কারণে।

ধরা যাক, একটি উপজেলায় একই পরীক্ষায় দুইজন শিক্ষার্থী অংশ নিল। একজন সরকারি বিদ্যালয়ের ছাত্র, অন্যজন কিন্ডারগার্টেনের। পরীক্ষায় কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীর নম্বর বেশি হলেও যদি কোটা সীমিত থাকে, তাহলে তার বৃত্তি পাওয়ার সুযোগ কমে যেতে পারে। এই ধরনের পরিস্থিতি মেধার স্বাভাবিক প্রতিযোগিতাকে বাধাগ্রস্ত করে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা তৈরি করতে পারে।

অবশ্য এই নীতির পেছনে সরকারের যুক্তিও রয়েছে। অনেক নীতিনির্ধারক মনে করেন, সরকারি বিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী অপেক্ষাকৃত নিম্ন বা মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। তাই তাদের উৎসাহিত করার জন্য বেশি সুযোগ রাখা প্রয়োজন। এই যুক্তির মানবিক দিক অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—একটি শ্রেণিকে উৎসাহিত করতে গিয়ে অন্য একটি শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সুযোগ সীমিত করে দেওয়া কতটা যৌক্তিক?

শিক্ষাবিদদের মতে, বৃত্তির মতো একটি পরীক্ষায় প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত সম্পূর্ণ মেধাভিত্তিক। কারণ শিক্ষা এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে সমান সুযোগের ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশু যখন দেখে যে তার পরিশ্রম ও মেধার যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে, তখন সে আরও উৎসাহ নিয়ে এগিয়ে যেতে পারে। কিন্তু যদি সে মনে করে যে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রটি সমান নয়, তাহলে তার মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।

আরও একটি বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশে কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের সংখ্যা কম নয়। বহু শহর, উপজেলা এবং এমনকি গ্রামাঞ্চলেও এসব বিদ্যালয় প্রাথমিক শিক্ষার বড় একটি অংশ পরিচালনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিক। ফলে তাদের জন্য বৃত্তির সুযোগ মাত্র ২০ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখা হলে তা অনেকের কাছে বৈষম্যমূলক বলে মনে হতে পারে।

একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমার ব্যক্তিগত অভিমত হলো—প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার মতো একটি ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠান নয়, বরং শিক্ষার্থীর যোগ্যতা ও পরিশ্রমই প্রধান বিবেচ্য হওয়া উচিত। মেধা কোনো নির্দিষ্ট বিদ্যালয়ের একচেটিয়া সম্পদ নয়; এটি সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীর মধ্যেই সমানভাবে থাকতে পারে। তাই বৃত্তির ক্ষেত্রেও সেই মেধার সঠিক মূল্যায়ন হওয়া জরুরি।
অবশ্যই সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উন্নয়নের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তাদের জন্য আলাদা সহায়তা, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ কিংবা আর্থিক সহায়তার মতো উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু বৃত্তির মতো একটি মেধাভিত্তিক পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সীমাবদ্ধতা তৈরি করা দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষাব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রাথমিক শিক্ষা একটি দেশের ভবিষ্যৎ গঠনের ভিত্তি। এখানে যদি সমান সুযোগ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হবে এবং প্রকৃত মেধাবীরাই সামনে আসবে। কিন্তু যদি শুরুতেই প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র সংকীর্ণ করে দেওয়া হয়, তাহলে সেই সম্ভাবনাও সীমিত হয়ে যেতে পারে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুবই মৌলিক—
একটি শিশুর ভবিষ্যৎ কি তার বিদ্যালয়ের পরিচয়ে নির্ধারিত হবে, নাকি তার মেধা ও পরিশ্রমের ভিত্তিতে?

শিক্ষাব্যবস্থার ন্যায়বিচার রক্ষার স্বার্থে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। কারণ শিক্ষা এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত মেধা, পরিশ্রম এবং সমান সুযোগের অধিকার। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে সেই ন্যায়বোধই আমাদের শিক্ষানীতির কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত।

লেখক: এন এইচ আশিক
শিক্ষক ও সাহিত্যিক

(মুক্তমতামত বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ওয়েবসাইট এর কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি।
Design & Development BY : ThemeNeed.com