বিজ্ঞাপন:
সংবাদ শিরোনাম:
বাড়িতে বিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ চাইতে গিয়ে ছাত্রদল নেতাকে মারধরের অভিযোগ, উল্টো মামলা সাভারে গৃহবধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণ, গ্রেপ্তার ৩ লালমনিরহাটে ৫০ বছর বয়সী নারীকে গণধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ রাষ্ট্রীয় খরচে আসামিপক্ষে আইনজীবী নিয়োগ দিল সরকার বরগুনায় কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে খালু গ্রেপ্তার পঞ্চগড়ে বুপ্রেনরফাইন ইনজেকশনসহ আটক ৩, কারাদণ্ড ও জরিমানা পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণ, ৪ মাসের অন্তঃসত্ত্বা মাদকের নেশায় পশু’তে রূপ, মস্তিষ্কে ঘটে বড় ধরনের পরিবর্তন অনলাইন-অফলাইনে জালনোট বিক্রি, ঈদ ঘিরে বেপরোয়া মৌসুমি অপরাধীরা কথায় জিরো টলারেন্স, বাস্তবে নেই, ভয়ংকর অপরাধের পেছনে মাদকাসক্তি
এক প্রান্তিক কণ্ঠস্বর কুড়িগ্রামের তাজু!

এক প্রান্তিক কণ্ঠস্বর কুড়িগ্রামের তাজু!

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার এক সাধারণ মানুষ তাজু, যার আসল নাম তাইজুল ইসলাম। কিন্তু সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে তিনি এক অজানা পরিচিতি পেয়েছেন। এই ভাইরাল হওয়ার পেছনে কোনো জনপ্রিয়তা বা সেলিব্রিটি হওয়ার ইচ্ছা ছিল না তার। তার উদ্দেশ্য ছিল খুবই সরল—নিজের এলাকার মানুষের কষ্ট তুলে ধরা, তাদের সমস্যা সমাধানে একটি বিকল্প পথ খোঁজা। কিন্তু তার কথাগুলো হাসি-তামাশার খোরাক হয়ে উঠে, যা একে অপরকে ব্যঙ্গ করার মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে কি তাজু শুধু হাসির পাত্র? না কি তার কণ্ঠে নিহিত রয়েছে এক প্রান্তিক জনগণের তীব্র ক্ষোভ আর অনুরোধ?

তাজু কি শুধুই হাসির খোরাক?
সম্প্রতি তাজুর একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তিনি কুড়িগ্রামের এক দোকানে গিয়ে জিলাপি বিক্রির দামে প্রশ্ন করেন। তার সরল প্রশ্ন—‘জিলাপি কত করে বিক্রি করছেন? সাদাডা কত, লালডা কত?’ এই প্রশ্ন ছিল শুধু একটি দোকানির কাছে, তবে তা পুরোপুরি হয়ে ওঠে একটি জনমানসে ছড়িয়ে পড়া ঘটনাবলি। ভিডিওটির পর অনেকেই তার বক্তব্যকে হাস্যরসে পরিণত করেন, তাকে মজা করার খোরাক হিসেবে গ্রহণ করেন। এর পেছনে কি শুধু সরলতা ছিল, নাকি আরও গভীর কিছু ছিল যা আমরা দেখিনি?

তাজু নিজেই বলেন, “আমি সাংবাদিক না। সাংবাদিকরা আমাদের চরাঞ্চলে আসেন না, তাই আমি নিজেই ভিডিও করি। আমি বোকাসোকা মানুষ, ভুল হতেই পারে। আমাকে ট্রল করলেও আমার কষ্ট নেই, আমি শুধু চাই আমাদের এলাকার উন্নয়ন হোক।” এই কথাগুলো কি আমাদের অন্তরকে নাড়া দেয় না? একজন প্রান্তিক মানুষ, যার কোনো মিডিয়া প্রশিক্ষণ নেই, কিন্তু যার মধ্যে নিজের এলাকার জন্য কাজ করার এক গভীর ইচ্ছা রয়েছে। আর তাইতো তার কণ্ঠস্বর আজ আমাদের কাছে পৌঁছেছে।

তাজু কি এক নতুন ধরনের নাগরিক সাংবাদিক?
আমরা আজকের গণমাধ্যমের যুগে যখন কথা বলি, তখন আমাদের কাছে সাংবাদিকতার পরিভাষা অনেকটা পেশাদারিত্বের দিকে চলে যায়। যেসব সাংবাদিকরা ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বুলেটিন পড়েন, স্টুডিওতে আলো ঝলমলে পরিবেশে কথা বলেন, তাদের পেশাদারিত্বে আমরা প্রশংসা করতে অভ্যস্ত। কিন্তু তাজু কি শুধুমাত্র কোনো সাধারণ মানুষ, যিনি ভুলভাল কথা বলে হাসির খোরাক হয়েছেন, নাকি তিনি নাগরিক সাংবাদিকতার এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন?

গণমাধ্যমের মূলধারার মানুষদের হয়তো মনে হতে পারে, তাজুর মতো একজন মানুষ কোনো দৃষ্টিতে সাংবাদিক হতে পারে না। কিন্তু “সিটিজেন জার্নালিজম” বা নাগরিক সাংবাদিকতা যে নতুন ধারণা, তাতে তাজুর মত মানুষই আমাদের চোখের সামনে এসে দাঁড়াচ্ছেন। মিডিয়া যেহেতু সব জায়গায় পৌঁছাতে পারে না, তাই অনেক সময় আমাদের চারপাশের পরিস্থিতি তুলে ধরতে তাজুর মতো মানুষের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আমরা কি তাজুকে নিছক হাসির পাত্র ভাবছি?
তাজু যে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছেন, তার পেছনে সাধারণত দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। একটি অংশ তাকে প্রশংসা করেছে, তাকে সরল ভাষায় জনগণের কষ্ট তুলে ধরার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছে। কিন্তু অন্যদিকে, একাংশ তাকে ব্যঙ্গ করে সামাজিক মাধ্যমেই মজা করেছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি নিজের সুবিধার্থে তার সরলতাকে হাস্যরসে পরিণত করছি? এমনকি তার বক্তব্যের গভীরতা উপেক্ষা করে, একটি সহজ মন্তব্যে তাকে শুধুমাত্র হাসির পাত্র বানিয়ে ফেলছি?
এটি ঠিক কীভাবে আমাদের সমাজের চিত্র ফুটে ওঠে? যদি আমরা “ভুল ভাষা” বা “অবৈধ” উপস্থাপনাকে মজা বানিয়ে ফেলি, তাহলে কি আমরা তার কষ্টকে সত্যি সত্যি উপলব্ধি করতে পারছি?

কেন তাজুর কণ্ঠে আমাদের প্রতিক্রিয়া দরকার?
যে সমাজে প্রান্তিক জনগণের কণ্ঠ সেভাবে শোনা যায় না, সেখানে তাজুর মতো একজন সাধারণ মানুষ উঠে দাঁড়িয়ে নিজের অভাব, দুঃখ, আর সমস্যা তুলে ধরেছেন—তাকে খাটো করে দেখার কোন কারণ থাকতে পারে না। তার কণ্ঠে যে ক্ষোভ রয়েছে, তা শুধু তার নয়—এটি প্রতিটি নাগরিকের ভেতরের ক্ষোভ, যারা প্রতিদিন অসম্ভব কষ্টে দিন কাটাচ্ছে।
কথা বলার জন্য আমাদের যতটা প্রস্তুতি, শিক্ষা আর পেশাদারিত্বের দরকার, ততটা কিন্তু তার নেই। তবুও সে যে বলছে, তা কি আমরা শুনে কিছুটা ভাবতে পারি? তাজুর কথায়, তার ভিডিওতে, এবং তার সরল প্রশ্নে লুকিয়ে রয়েছে একটি ক্ষুদ্র জনগণের ব্যথা, তাদের নিঃসঙ্গতা এবং সরকারের কাছে তাদের একটাই আবেদন—একটি ব্রিজ, একটি সেতু, একটি পথ।

তাজু কি আমাদের ভাবনার খোরাক?
তাজু বোকাসোকা, সরল, কিন্তু তার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে এক অসীম ইচ্ছাশক্তি। যে ইচ্ছা তার এলাকার উন্নয়ন, জনগণের দুঃখের মিটান, জীবনের সংকটের সমাধান। তাঁর মতো একজন মানুষের ভিডিও যদি হাসির খোরাক হয়ে যায়, তবে আমাদের প্রশ্ন অবশ্যই উঠবে—আমরা তার কণ্ঠে মজা খুঁজছি, কিন্তু তার কথায় কি আমরা একটু সত্যিই ভাবতে পারি?
এখন সময় এসেছে, তার সরলতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সমস্যাগুলোর দিকে নজর দেওয়ার। তাজু যদি না উঠত, যদি তার মতো এক প্রান্তিক কণ্ঠস্বর সোশ্যাল মিডিয়ায় না আসত, তাহলে কি আমাদের সমাজ এসব সমস্যার দিকে তাকানোর সুযোগ পেত?

লেখক: রাশেদুল ইসলাম রাশেদ


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ওয়েবসাইট এর কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি।
Design & Development BY : ThemeNeed.com