বিজ্ঞাপন:
এতিমের হক খালে-পুকুরে, আছে মাটির নিচে!

এতিমের হক খালে-পুকুরে, আছে মাটির নিচে!

স্টাফ রিপোর্টার: কুরবানির পশুর চামড়া বিক্রির অর্থের ওপর নির্ভর করে দেশের বহু এতিমখানা ও কওমি মাদ্রাসা। কিন্তু এবারের ঈদে চামড়ার বাজারে ধস নামায় এসব প্রতিষ্ঠানের আয় বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ট্যানারি মালিকদের প্রভাব, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে সরকার নির্ধারিত দাম বাস্তবে মিলছে না। ফলে অনেক স্থানে চামড়া বিক্রি না হওয়ায় সেগুলো মাটিতে পুঁতে ফেলা কিংবা খাল-বিল ও পুকুরে ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

বরিশাল, খুলনা, সাতক্ষীরা, কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় চামড়া বিক্রি করতে না পেরে হতাশায় ভুগছেন মাদ্রাসা ও এতিমখানা কর্তৃপক্ষ, পাশাপাশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরাও।

বরিশালে দানের চামড়ায় মধ্যস্বত্বভোগীর থাবা:
বরিশালের এতিমখানা ও কওমি মাদ্রাসাগুলোর পরিচালকদের অভিযোগ, সরকার প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করলেও বাস্তবে একটি চামড়া বিক্রি হয়েছে মাত্র ১৫০ থেকে ৪০০ টাকায়। অনেক ক্ষেত্রে ছাগলের চামড়ার কোনো দামই পাওয়া যায়নি।

বরিশাল জেলায় ৬৭টি কওমি মাদ্রাসা ও ৮৮টি এতিমখানা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অংশের ব্যয় নির্বাহ হয় কুরবানির চামড়া বিক্রির অর্থ থেকে। কিন্তু কয়েক বছর ধরে তারা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

নগরীর পলাশপুর এলাকার একটি কওমি মাদ্রাসার পরিচালক ক্বারি অহিদুল ইসলাম জানান, ২৫টি গরু ও ছয়টি ছাগলের চামড়া সংগ্রহ করলেও গরুর চামড়ার গড় মূল্য ৩০০ টাকার বেশি পাননি। ছাগলের চামড়াগুলো বিনামূল্যে দিয়ে দিতে হয়েছে।

চরবাড়িয়ার একটি এতিমখানার পরিচালক আবু বকর বলেন, আগে চামড়া বিক্রির অর্থে কয়েক মাসের খাদ্য ব্যয় মেটানো যেত। এবার সাত-আটটি ছাগলের চামড়া কেউ কিনতে রাজি না হওয়ায় মাটিতে পুঁতে ফেলতে হয়েছে।

অন্যদিকে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, তারা নিজেরাও ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত দাম পান না। পোর্ট রোড এলাকার ব্যবসায়ী নাসির আহম্মেদের দাবি, ঢাকার ট্যানারিগুলো কম দামে চামড়া কিনছে এবং আগের পাওনাও সময়মতো পরিশোধ করছে না।

তবে ট্যানারি মালিকদের সংগঠনের নেতারা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, গত বছরের তুলনায় এবার তারা বেশি দামে চামড়া কিনছেন। তাদের মতে, মাঠপর্যায়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে দামের অসঙ্গতি তৈরি হচ্ছে।

খুলনা-সাতক্ষীরায় ক্রেতাশূন্য বাজার:
খুলনা ও সাতক্ষীরায় গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে মাত্র ২০০ থেকে ৪০০ টাকায়। অনেক কুরবানিদাতা ও ব্যবসায়ী কাঙ্ক্ষিত মূল্য না পেয়ে চামড়া বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়েছেন। কেউ মাটিতে পুঁতে ফেলেছেন, কেউ খাল-বিল কিংবা নদীতে ফেলে দিয়েছেন।

সাতক্ষীরার একটি মাদ্রাসার খতিব হাফেজ রেজাউল করিম জানান, সারা দিন অপেক্ষার পরও কোনো ক্রেতা না পাওয়ায় মাদ্রাসা প্রাঙ্গণেই চামড়া পুঁতে ফেলতে হয়েছে।

খুলনার ব্যবসায়ী আবু মুছা বলেন, সংরক্ষণ ও পরিবহণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ৪০০ টাকার বেশি দামে চামড়া কেনা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক চামড়া ট্যানারিগুলো গ্রহণও করতে চায় না।

সাতক্ষীরা শহর, শ্যামনগর, তালা ও কলারোয়ার বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি না হওয়া চামড়া পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে। অনেক কুরবানিদাতা অভিযোগ করেছেন, সরকার দাম নির্ধারণ করলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয় না।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ভুক্তভোগীদের দাবি, আড়তদারদের একটি সিন্ডিকেট কৃত্রিমভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে সরকারি মূল্য তালিকা কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকছে।

জাতীয় চামড়া শিল্প রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক মুফতি আব্দুল্লাহ ইয়াহিয়া বলেন, চামড়ার দাম কমলেও চামড়াজাত পণ্যের দাম কমেনি। বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার সুযোগে মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভবান হচ্ছে, আর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো।

কুমিল্লায় খোলা আকাশের নিচে নষ্ট হচ্ছে চামড়া:
কুমিল্লার বিভিন্ন মাদ্রাসা ও এতিমখানায় হাজার হাজার চামড়া বিক্রি না হয়ে পড়ে আছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, সংগ্রহ ও সংরক্ষণের খরচ করার পরও ক্রেতার দেখা মিলছে না।

দেবিদ্বার উপজেলার পান্নারপুল কানযুল উলুম মাদ্রাসার মোহতামিম মাওলানা গিয়াস উদ্দিন জানান, প্রায় ২৫০টি চামড়া লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় এখন খরচের টাকা ওঠানো নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

মৌসুমি ব্যবসায়ীরাও বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন। নাঙ্গলকোটের ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন বলেন, লাভের আশায় চামড়া সংগ্রহ করলেও এখন বিক্রি করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। একই অভিযোগ করেছেন আরও অনেক ব্যবসায়ী।

কওমি মাদ্রাসা সংগঠনের সভাপতি আল্লামা নুরুল হক বলেন, বহু মাদ্রাসা ও এতিমখানা চামড়া সংরক্ষণ করেও বিক্রি করতে পারছে না। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের দ্রুত ও কার্যকর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

উদ্বেগ বাড়ছে দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে:
চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এতিমখানা ও কওমি মাদ্রাসাগুলো। কুরবানির মৌসুমে যে অর্থ তাদের কয়েক মাসের ব্যয় মেটাতে সহায়তা করত, এবার সেই উৎস প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ফলে এতিম শিশুদের ভরণপোষণ, শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ওয়েবসাইট এর কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি।
Design & Development BY : ThemeNeed.com