জিল্লুর রহমান পলাশ: নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক সুরক্ষাকে কেন্দ্র করে নতুন সরকারের সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগ—‘ইলেকট্রনিক ফ্যামিলি কার্ড’। এটি কেবল একটি সহায়তা কর্মসূচি নয়; রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে একটি নতুন সামাজিক চুক্তির সূচনা।

তারেক রহমান ঘোষিত ‘রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা’ রূপরেখার অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে এই কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে দেশের আটটি বিভাগের আটটি উপজেলায় পাইলটিং শুরু হবে। অর্থমন্ত্রীকে সভাপতি করে ১৫ সদস্যের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে। লক্ষ্য—আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগেই কার্ড বিতরণ। কার্ডটি দেওয়া হবে পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক নারী সদস্যের নামে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ১৯ ফেব্রুয়ারির প্রজ্ঞাপন পর্যালোচনায় স্পষ্ট—এটি কেবল ভাতা বা খাদ্য সহায়তা নয়; বরং একটি কাঠামোবদ্ধ সামাজিক সুরক্ষা বলয় গড়ে তোলার পরিকল্পনা। ২৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রস্তুতের নির্দেশ উদ্যোগটির প্রশাসনিক অগ্রাধিকারকেই স্পষ্ট করে।

এই লেখা সরকার বা শীর্ষ নেতৃত্বের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য নয়; বরং স্থানীয় নেতাকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী ও সচেতন নাগরিকদের বিবেচনার জন্য। প্রত্যাশা একটাই—এই কর্মসূচি যেন অনিয়মের নতুন অধ্যায়ে পরিণত না হয়।
ফ্যামিলি কার্ড কী, কারা পাবেন? ফ্যামিলি কার্ড একটি ইলেকট্রনিক সামাজিক সুরক্ষা কার্ড, যা পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক নারী সদস্যের নামে ইস্যু হবে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি একটি “সামাজিক চুক্তি”—যেখানে নারী করুণার পাত্র নন; উন্নয়নের দায়িত্বশীল অংশীদার।
দারিদ্র্য বিমোচন দান নয়; এটি মানুষের সক্ষমতায় বিনিয়োগ। পরিবারের অর্থব্যবস্থাপনায় নারীর ভূমিকা বিবেচনায় কার্ডটি নারীর নামেই দেওয়া হবে—এটি প্রতীকী নয়, নীতিগত অবস্থান।
কী সুবিধা? প্রাথমিকভাবে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার অগ্রাধিকার পাবে। কার্ডধারী পরিবার মাসে ২,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকা সমমূল্যের খাদ্য সহায়তা—চাল, আটা, ডাল, তেল—অথবা সমপরিমাণ নগদ অর্থ পাবে। দীর্ঘমেয়াদে দেশের সব পরিবারকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।
নীতিগতভাবে উদ্যোগটি সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয়। কিন্তু মূল প্রশ্ন—বাস্তবায়ন কতটা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হবে?
অভিজ্ঞতা যা সতর্ক করে : অতীতের ভিজিএফ, ভিজিডি, জিআরসহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দালালচক্রের অভিযোগে বহুবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। প্রকৃত দরিদ্র বাদ পড়েছে, প্রভাবশালীরা সুবিধা নিয়েছে। তালিকা নিয়ে দ্বন্দ্ব, হামলা-মামলা, এমনকি চাল লুটের ঘটনাও ঘটেছে।

গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে গাইবান্ধায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সমাজসেবা, মহিলা বিষয়ক ও পল্লী উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ বিতরণ নিয়ে অসংখ্য অভিযোগ প্রত্যক্ষ করেছি। ভিজিএফ-ভিজিডি তালিকা নিয়ে অনিয়ম, বরাদ্দ ফাঁস, সুবিধা থেকে বঞ্চিত মানুষের দীর্ঘশ্বাস—এসব বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
করোনাকালে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সহায়তার অর্থ আত্মসাতের ঘটনাও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। সাদুল্লাপুর উপজেলার একটি ইউনিয়নে অনিয়মের তথ্যচিত্র প্রচারের পর প্রশাসনিক তদন্তে সত্যতা মিলেছে; বরখাস্তও হয়েছেন সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধি। কিন্তু বিচ্ছিন্ন শাস্তি কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করে না।
বাস্তবতা বলছে—ভালো নীতিও দুর্বল বাস্তবায়নে প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
এখন সবচেয়ে জরুরি এবং সরকারের কাছে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা— সুবিধাভোগী নির্বাচন যেন কোনোভাবেই স্বজনপ্রীতি, অর্থ লেনদেন, দালালচক্র কিংবা দলীয় প্রভাবনির্ভর তালিকার ওপর নির্ভরশীল না হয়।
সুবিধাভোগী নির্বাচন হতে হবে তথ্যভিত্তিক, যাচাইযোগ্য ও সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ। স্বজনপ্রীতি ও দালালির পথ কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তালিকা প্রণয়ন নিশ্চিত করতে হবে।
যদিও নির্বাচনের আগে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। ভোটের মাঠে প্রতিশ্রুতি, বাড়ি বাড়ি গিয়ে নারীদের আশ্বাস—সব মিলিয়ে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। কিন্তু তাড়াহুড়ো করে বাস্তবায়ন করা হলে ডাটা ঘাটতি, ভুল তালিকা ও দুর্নীতির ঝুঁকি বাড়ত—এটিও অস্বীকার করা যায় না।
এখন সময় আছে—সঠিক উপকারভোগী চিহ্নিত করে প্রক্রিয়াকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ শুধু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সহায়তা নয়; এটি হতে পারে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের কার্যকর হাতিয়ার এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন আস্থার সূচনা।
কিন্তু সফলতার গল্প লেখা হবে কি না—তা নির্ভর করছে বাস্তবায়নের ওপর। নীতির ঘোষণা যত শক্তিশালীই হোক, প্রয়োগে দুর্বলতা থাকলে আস্থা ভেঙে যায়। মাঠের অভিজ্ঞতা বলছে—ভালো উদ্যোগও অনিয়মে কলঙ্কিত হতে সময় লাগে না।
আমাদেরও দায়িত্ব আছে। কেবল সরকারের নয়। তথ্য দেওয়া, সঠিক পরামর্শ দেওয়া, অনিয়ম দেখলে প্রতিবাদ করা—এসব সামাজিক দায়িত্ব এড়িয়ে গেলে চলবে না। স্থানীয় নেতাকর্মী ও সচেতন নাগরিকদের প্রতি আহ্বান—এই কর্মসূচিকে স্বচ্ছ রাখতে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিন। ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে প্রকৃত উপকারভোগীর অধিকার নিশ্চিত করুন।

‘ফ্যামিলি কার্ড’ এখন একটি সম্ভাবনার নাম। এটি হতে পারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসনের দৃষ্টান্ত—
অথবা অনিয়ম, লুটপাট ও দালালি বাণিজ্যের পুনরাবৃত্তি।
পছন্দটি এখন বাস্তবায়নের হাতে।
জনগণের প্রত্যাশা স্পষ্ট—
এই কার্ড হোক স্বচ্ছতার মডেল; লুটপাট ও দালালি বাণিজ্যের নয়।
(মুক্তমতামত বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
লেখক:জিল্লুর রহমান পলাশ।
জেলা প্রতিনিধি, যমুনা টেলিভিশন ও বাংলা ট্রিবিউন, সাধারণ সম্পাদক, সাদুল্লাপুর প্রেসক্লাব, গাইবান্ধা
Leave a Reply