মুক্তমতামত ডেস্ক: হেরে গিয়ে অনেক তথাকথিত অতি পণ্ডিত এখন ভোটারদের ‘মফিজ’, ‘ভোঁদাই’, ‘বোকা’ ইত্যাদি বলে কটাক্ষ করছেন। ফেসবুকে বড় বড় পোস্ট দিচ্ছেন—যাদের অনেককেই আমরা চিনি। অথচ বাস্তবে ভোটারদের কাছে গিয়ে ভোট চাইবার মতো সাহস বা শ্রম কোনোটাই ছিল না তাদের। হোটেল-বাজারে বসে গল্প জুড়ে দেন, কেন্দ্রভিত্তিক হিসাব কষেন, নিজেকে বড় নেতা ভাবেন; বলেন, “সব কেন্দ্রে আমরা ফার্স্ট হবো।” কিন্তু বাস্তবে একজন ভোটারের দরজায় গিয়েও কখনো সমর্থন চাননি।

মূল কথা হলো—জনগণ যাকে যোগ্য ও ভালো মনে করেছে, তাকেই ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে। আবার জনগণের ভোটেই অনেকে পরাজিত হয়েছেন। এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক নিয়ম। এতে ভোটারদের দোষ কোথায়?
একটি গণতান্ত্রিক দেশে যেকোনো আসনে, যেকোনো দলের প্রার্থী বিজয়ী হতে পারেন। দেশের মানুষ কি আগে থেকেই জানে কোন দল সরকার গঠন করবে?

প্রত্যেক দলের সমর্থকই চায় তার দল ক্ষমতায় যাক। সেই প্রত্যাশা, বিশ্বাস ও বিবেচনা থেকেই মানুষ ভোট দেয়।
তাই ভোটের ফল পছন্দ না হলেই ভোটারদের অপমান করা নয়—গণতন্ত্রকে সম্মান করা শিখুন। জয়-পরাজয় রাজনীতির অংশ, কিন্তু জনগণের রায়ই চূড়ান্ত।
ভোটের পর থেকেই ফেসবুকে ঘুরছে এসব লেখা—চোখে পড়লেই মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, মুখে চলে আসে অপ্রিয় ভাষা। কিন্তু সামনে পাই না সেই জ্ঞানী-পণ্ডিতদের, যারা মানুষকে ‘মফিজ’ বলে অপমান করছেন। হেরে গিয়ে বোধহয় কারও কারও জ্ঞানের তার একটু বেশিই টনটন করছে! অথচ অন্যের ভুল ধরার আগে নিজের লেখার ভুল, নিজের আচরণের ত্রুটি—সেটা বুঝতে পারেন ক’জন?
আমার এই কথাগুলোও হয়তো তাদের কাছে ভুল মনে হবে। হোক না—তাতে আমার ক্ষতি কী? আমি কোনো প্রার্থী নই, কোনো দলের নেতাকর্মীও নই। আমার ভোট কমবে না। আমি একজন সাধারণ ভোটার, নাগরিক হিসেবে আমার কথা বলছি।

বাস্তবতায় ফিরে নিজের ভুলটা খুঁজুন। কোথায় ঘাটতি ছিল? কোন আচরণে, কোন কথায়, কোন কাজে জনমনে জায়গা করে নিতে পারেননি—সেটা বিশ্লেষণ করুন। বাড়ি-বাড়ি, গ্রাম-ইউনিয়ন, পাড়া-মহল্লা ধরে হিসাব কষুন—কার ভোট পেয়েছেন, কারটা পাননি? কেন পাননি?
মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস কেন আপনাদের ওপর বাড়ছে না—সেটাই বড় প্রশ্ন। শুধু ভাবলেই হবে না—“আমরাই সেরা, আমরাই যোগ্য।” ভোট পেতে চাইলে আত্মসমালোচনা করতে হবে। এখনকার জনগণ সচেতন; তারা বোঝে মাঠে কে কতটা আন্তরিক, আর কে শুধু মাইক, পোস্টার আর স্লোগানে নেতা।
মাঠে প্রার্থী অনেকেই থাকেন—প্রত্যেকেই নিজেকে যোগ্য বলেন, বাকিদের অযোগ্য প্রমাণে ব্যস্ত থাকেন। সারাদিন নিজের ঢোল পেটালেই হবে না, পাড়া-মহল্লায় মাইক বাজালেই হবে না। কথা কানে পৌঁছালেই তা মনে পৌঁছায় না। ভোটার শোনেন ঠিকই, কিন্তু মনে গেঁথে নেন না সবার কথা। কারণ একজন ভোটারের ভোট একটাই। তিনি একাই ভাবেন, বিচার করেন, বুঝে-শুনে ভোটের দিন পছন্দের প্রতীকে সিল মারেন।
ভোটার এখন আর অজ্ঞ নন। তাদের ‘মফিজ’ বা ‘ছাগলের বাচ্চা’ বলে গালি দেওয়া শুধু অপমান নয়, নিজের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের পরিচয়। হেরে গিয়ে মানুষের উদ্দেশে নেগেটিভ, তাচ্ছিল্যপূর্ণ কথা বললে তার জবাব সময়ই দেবে। জনগণের রায়কে অবজ্ঞা করলে তার প্রতিক্রিয়া অনিবার্য।
মনে রাখুন—জনগণই শক্তি, জনগণই শেষ কথা। তাই আরও কৌশলী হন, ধৈর্যশীল হন। এখন থেকেই মানুষের কাছে যান, পাশে থাকুন। তাদের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হন, বিপদে এগিয়ে আসুন, প্রয়োজনে নিরবে কাজ করুন। সম্মান দিন, সম্মান পাবেন।
এ বাড়ি, ও বাড়ি; পাড়া, গ্রাম, মহল্লার মানুষ একদিন জোট বাঁধবেই। সেই দিনই বিজয়ের দেখা মিলবে—স্লোগানে নয়, আস্থায়; প্রচারে নয়, সম্পর্কের শক্তিতে।
ততদিন ভালো থাকুন। নিজের পরিবারকে ভালো রাখুন, প্রতিবেশী ও আশপাশের মানুষদের ভালো রাখুন। কারণ রাজনীতির মূলেই আছে মানুষ—আর মানুষকে সম্মান করতে জানলেই একদিন সম্মান ফিরে আসে।
ভোট কেবল রাজনৈতিক পরিভাষা নয়—এটি নাগরিক আত্মসম্মানের ভাষা। ভোট দেওয়া মানে শুধু প্রতিনিধি নির্বাচন নয়; নিজের মত, অবস্থান ও ভবিষ্যতের ওপর সচেতন স্বাক্ষর রাখা। এবারের নির্বাচন প্রমাণ করেছে—মানুষ এখন আরও সচেতন, আত্মমর্যাদাবান ও সক্রিয় নাগরিক।

একজন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রত্যক্ষ করেছি। ভোটকেন্দ্রের ভেতর-বাইরের পরিবেশ ছিল শান্ত ও শৃঙ্খলাপূর্ণ। সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের চোখেমুখে ছিল প্রশান্তি, আত্মবিশ্বাস ও সংযত গর্ব—যেন তারা রাষ্ট্রের সামনে নিজের নাগরিক পরিচয় নিবন্ধন করতে এসেছে।
দিনভর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয় উপস্থিতি এবং সশস্ত্র বাহিনীর দায়িত্বশীল ভূমিকা ভোটারদের আস্থায় বড় ভূমিকা রেখেছে। মানুষের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেছে—রাজনীতিবিদদের প্রতি তাদের প্রত্যাশা অনেক।
ভোট কোনো একদিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি। তাই আবেগ নয়, বিবেক ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্তই দায়িত্বশীল নাগরিকের পথ।
মনে রাখতে হবে—ভোট মানুষের আমানত ও অধিকার। অসৎ বা অযোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেওয়া আর মিথ্যার পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়া একই কথা। সৎ প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনা কম হলেও সততার পক্ষেই অবস্থান নেওয়া উচিত; নচেৎ আমানতের খিয়ানত হয়। আপনার ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি ভালো কাজ করলে তার নৈতিক অংশীদার আপনিও।
লেখক: জিল্লুর রহমান পলাশ
গণমাধ্যমকর্মী
( মুক্তমতামত বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
Leave a Reply