আসাদুল ইসলাম সবুজ: লালমনিরহাট কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ প্রকৌশলী আইনুল হকের বিরুদ্ধে ১ কোটি ৫২ লাখ ৯ হাজার ১৬৫ টাকার দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। বিগত ফ্যাসিবাদী, স্বৈরাচার আওয়ামী সরকারের কুড়িগ্রাম-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাফর আলীকে ধর্মপিতা দায় দিয়ে বর্তমান লালমনিরহাট কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ প্রকৌশলী আইনুল হক কুড়িগ্রাম টিটিসিতে দায়িত্বরর্ত অবস্থায় নানান অপকর্ম করে তিনবার বরখাস্ত হয়েছেন।

শুধুমাত্র অধ্যক্ষ পদে যোগদানের পর এত অল্প সময়ে অঢল সম্পদের মালিক বনে যাওয়ায় পরিচালক, দুর্নীতি দমন কমিশনের নিকট কুড়িগ্রাম কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ সৈয়দ মোঃ রেজাউল করিম খন্দকার এ অভিযোগ দায়ের করেন। যার স্মারক নং-৪৯.০১.৪৯০০.০০০.১৮.০০২.২-৩১২।
ওই অভিযোগে বলা হয়, কুড়িগ্রাম টিটিসিতে ২০১৫ থেকে ২০২০ পর্যন্ত উপাধ্যক্ষ থাকাকালীন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দায়িত্ব পালন করেন প্রকৌশলী আইনুল হক। এরপর আবারো ২০২২ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত অধ্যক্ষের দায়িত্বে থাকালীন সময় তার নামে নারী কেলেঙ্কারিসহ একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠায় ১৪.০৪.২০২৫ইং তারিখে লালমনিরহাট টিটিসিতে বদলি করা হয়। লালমনিরহাট টিটিসিতে যোগদানের পর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অধ্যক্ষ প্রকৌঃ আইনুল হক ৫০ লক্ষ টাকার উপরে নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থ আত্মসাতের লক্ষ্যে নিজের পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিয়ে কেনাকাটা করেছেন। ফলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিবের নিকট একজন ঠিকাদার অভিযোগ দাখিল করেছেন।

এর আগে তিনি কুড়িগ্রাম টিটিসিতে দায়িত্ব পালনকালে অধ্যক্ষ প্রকৌশলী আইনুল হকের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎতের ঘটনা ফাঁস হয়ে পড়ে। ২০১৯ সালে টিটিসির ভিলস এন্ড ট্রেনিং এ্যানহেন্সমেন্ট প্রকল্পের আওতায় প্রকল্প পরিচালকের অনুমোদন গ্রহণ না করেই খাদিজা ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনালের নামে বিল-ভাউচার তৈরি করে অধ্যক্ষ নিজেই ধোলাইখাল হতে ওয়ানিং মেশিনসহ প্যাকেজের মালামাল ক্রয়ে ৩ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা। একই বছরে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে অধ্যক্ষ পুরাতন ডিহিউমিডি ফায়ার, হট এন্ড ফুল ওয়াটার ডিসপেনসার, হ্যালাইড লিক ডিটেক্টর এবং স্পট ওয়েন্ডিং মেশিন সহ মালামাল ক্রয়ে ৩ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা। স্কিলস এন্ড ট্রেনিং এ্যানযেন্সমেন্ট প্রজেক্ট প্রভেজের মালামাল ক্রয়ের পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিয়ে ৮ লাখ টাকা। কম্পিউটার প্রোটোকলকে নিম্নমানের বাঁশ, কাঠ, রড, বালি, সিমেন্ট ক্রয় দেখিয়ে ৫ লাখ টাকাসহ দরদাতার সাথে যোগসাজোস করে ২০ লক্ষ টাকা।

এছাড়াও ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরে অন্যান্য রাজস্ব বাজেটের আওতায় ভবন স্থাপনা ও মেয়ামত খাতে কুড়িগ্রাম টোটালর পরাম ঐ তারিখের স্মারক নং ৪৯.০১.৪৯০০.০০৩.১৮.০০২.২৬/২০২০ কোটেশনের মাধ্যমে ৪ লাখ ১১ হাজার ৩৯৬ টাকার নাম মাত্র সাইকেল গ্যারেজ নির্মাণে নিম্নমানের কাজ করে ৩ লাখ ৬৪ হাজার ৮৫ টাকা। ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে অন্যান্য রাজস্ব বাজেটের আওতায় ভবন স্থাপনা ও মেরামত খাতে (বিল নং ৩১ ও ৩২) ও ক্যাশ মোমো ৪৫৯৭ ও ৪৫৯৮ মাধ্যমে এবং একই অর্থবছরে অন্যান্য রাজস্ব বাজেটের মেরামত খাতে (বিল নং ১৩,১৪,২১,২৬) মেসার্স আর কে ব্রিক্স ভাউচার নং-২৩১৭ এর মাধ্যমে বিভিন্ন তারিখে চারবার ইট ক্রয় দেখিয়ে কয়েক লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
অপরদিকে অধ্যক্ষ প্রকৌশলী আইনুল হক কুড়িগ্রাম কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নিয়মিত/স্বনির্ভর ও এনজিও কর্তৃক পরিচালিত কোর্স ও হাউজ কিপিং কোর্সের প্রশিক্ষণার্থীদের নিকট হতে ২০২০ সাল পর্যন্ত হোস্টেলে থাকা বাবদ আদ্যয়কৃত ১ কোটি ৬১ লাখ ২৭ হাজার ৬২৫ টাকা। তারমধ্যে ১ কোটি ৩০ লক্ষ ৯১ হাজার ১৭৩ টাকা নিয়ম বর্হিভুতভাবে বিভিন্ন খাতে খরচ দেখিয়ে অবশিষ্ট ৩০ লক্ষ ৭৬ হাজার ৪৫২ টাকা সরকারী কোষাগারে জমা প্রদান না করে আত্মসাৎ করেছেন। এছাড়াও ড্রাইজিং (প্রাকটিক্যাল এ্যাকশন বাংলাদেশ ও মহিদেব), ইন্ডাস্ট্রিয়াল সুইং মেশিন অপারেশন, ওয়েল্ডিং, মোবাইল ফোন সার্ভিসিং, অটোক্যাড (স্ব-নির্ভর), ইংলিশ (স্ব-নির্ভর), ইলেকট্রিক্যাল, গ্রাফিক্স ডিজাইন, কম্পিউটার, ড্রাইডিং (স্ব-নির্ভর), ওয়েন্ডিং (নিয়মিত), ইলেকট্রিক্যাল (নিয়মিত), ইলেকট্রনিক্স (নিয়মিত), সিভিল (নিয়মিত), গার্মেন্টস (নিয়মিত), কম্পিউটার (নিয়মিত), আডএসি (নিয়মিত)ও হাউজকিপিং কোর্সের ভর্তি ফি বাবদ আদায়কৃত ১ কোটি ২৪ লাখ ৯ হাজায় ৮০০ টাকা। তারমধ্যে ৯১ লক্ষ ৯৮ হাজার ৫০৩ টাকা বিধি সম্মত ও বিধি বহির্ভুত ভাবে খরচ অবশিষ্ট ৩২ লাখ ১১ হাজার ২৯৭ টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

২০১৭ সাল হইতে ২০২০ সাল পর্যন্ত কুড়িগ্রাম কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে মহিদের এনজিও কর্তৃক পরিচালিত কোর্সের প্রশিক্ষণার্থীদের হোস্টেল ফি বাবদ আদায়কৃত অর্থ-৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪০০ টাকার মধ্যে সরকারী কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে ১২ হাজার ৯৮৪ টাকা। অবশিষ্ট ৪ লাখ ২১ হাজার ৪১৬ টাকা সহ কুড়িগ্রাম কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের হাউজ কিপিং কোর্সে অযোগ্য প্রশিক্ষণার্থী ভর্তি ও সার্টিফিকেট প্রদান করে দূর্নীতির মাধ্যমে সাবেক অধ্যক্ষ প্রকৌঃ আইনুল হক প্রায় ১০ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
২০১৫ সাল কুড়িগ্রাম টিটিসিতে ২৩২টি ব্যাচে ৪৩৮৯ জন কে প্রশিক্ষণ প্রদান করে সদদায়ন করেছেন। কিন্তু অর্থনৈতিক হিসাবে দেখা যায় ৩৮৯০ জনের হিসাব আছে। ৪৯৬ অনের কোন হিসাব নাই। এছাড়াও নূন্যতম ৫ম শ্রেণী পাশ সম্পন্ন প্রশিক্ষনার্থী ভর্তির নির্দেশনা থাকলেও অধ্যক্ষ প্রকৌঃ মোঃ আইনুল হকের মৌখিক নির্দেশনায় অক্ষরজ্ঞান সম্পন্নহীন প্রশিক্ষনার্থী অবৈধ অর্থের বিনিময়ে ভর্তি করে সনদ বানিজ্য করেছেন। এছাড়াও অধ্যক্ষ আইনুল হক কোনরুপ বিল ভাউচার ছাড়াই হাউজ কিপিং ফোর্সের ইনচার্জ সিগ্রা রানী সেনের নামে ৩ লাখ ২৪ হাজার ৫০০টাকা উত্তোলন দেখিয়ে আত্মসাত করেছেন।
কুড়িগ্রাম কারিগরি প্রশিক্ষন কেন্দ্রে নিয়ম বহির্ভূতভাবে একই ব্যক্তিকে একাধিক পদে নিয়োগ, আত্মীয়-স্বজন প্রকল্পের বা আউট সোর্সিংয়ে নিয়োগ, প্রকল্পে নিয়ম বহির্ভূতভাবে প্রশিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এলজিইডি কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন প্রভাতী প্রকল্প হতে নিয়ম বহির্ভূতভাবে ২০ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৯ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। ২০২৫ সালে দুর্নীতি ও নারী কেলেঙ্কারিসহ একাধিক অভিযোগে অভিযুক্ত কুড়িগ্রাম টিটিস’র অধ্যক্ষ আইনুল হকের পদত্যাগের দাবিতে কুড়িগ্রাম জেলা কলেজ মোড় এলাকায় মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

এদিকে বিগত ফ্যাসিবাদী, স্বৈরাচার আওয়ামী সরকারের কুড়িগ্রাম-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাফর আলীকে ধর্মপিতা দায় দিয়ে তার আশীর্বাদেই অধ্যক্ষ আইনুল হক উপাধ্যক্ষ হতে অধ্যক্ষ পদে প্রমোশন পান। আওয়ামী সরকারের জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিমের সাথে সখ্যতা থাকার কারণে বারবার নানা অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে সাময়িক বরখাস্ত থাকলেও পরবর্তীতে পুনরায় চাকরীতে বহাল থাকেন এবং প্রায় ১০ বছর ধরে একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকেন। তিনি আওয়ামী সরকারের আমলে বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রোগ্রামে মোটা অংকের টাকা ডোনেট করতেন। ৫ আগস্টের পরে ভোল পাল্টে এখন নিজেকে জামায়াত ইসলামের কর্মী বলে পরিচয় দেন। এমনকি বিনা কারণে চাকুরীচ্যুতি করার কারণে আসমাতু জান্নাত রোজা শ্রম আদালত রংপুরে অধ্যক্ষ আইনুল হকের বিরুদ্ধে মামলা করেন। যা এখনও বিচারাধীন।
অথচ আইনুল হকের পূর্ব পুরুষ ভারত থেকে খালি হাতে বাংলাদেশে আসছেন। তিনি টিটিসি’র অধ্যক্ষ পদে চাকুরী করে দুর্নীতির মাধ্যমে এবং হাউজ কিপিং কোর্সের ভুয়া প্রশিক্ষণার্থীদের নিকট সার্টিফিকেট বিক্রি করে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। এসব দুর্নীতির টাকায় অধ্যক্ষ প্রকৌঃ আইনুল হকের মালিকানাধীন নর্থ বেঙ্গল ইসলামিক ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এনআইআইএসটি) (কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কোড নং-১৫০৯৬) নামে একটি প্রতিষ্ঠান করেছেন। প্রতিষ্ঠানটির লালমনিরহাট শহরের উচাটারী ও আদিতমারী উপজেলায় ক্যাম্পাস রয়েছে। সেখানে তার স্ত্রী আবেদা সুলতানা পরিচালক এবং আইনুল হক নিজে আছেন উপদেষ্টা হিসেবে। তাছাড়া অধ্যক্ষ আইদুল হকের রয়েছে ঢাকায় কোটি টাকার ফ্লাট, লালমনিরহাটে নির্মানাধীন ৫ তলা ভবন, জমি-জমা, ব্যাংকে রয়েছে নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকা। বিগত ফ্যাসিবাদী, স্বৈরাচার আওয়ামী সরকারের কুড়িগ্রাম-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাফর আলীকে ধর্মপিতা দায় দিয়ে শুধুমাত্র অধ্যক্ষ পদে যোগদানের পর এত অল্প সময়ে অঢল সম্পদের মালিক বনে যাওয়ায় পরিচালক, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সহ বিভিন্ন দপ্তরে বর্তমান কুড়িগ্রাম কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ সৈয়দ মোঃ রেজাউল করিম খন্দকার এ অভিযোগ দায়ের করেন। যার স্মারক নং- ৪৯.০১.৪৯০০.০০০.১৮.০০২.২৫-৩১২, তাং-০৭/০৭/২০২৫।

এ বিষয়ে লালমনিরহাট কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ প্রকৌশলী আইনুল হক বলেন, ওইসব অভিযোগের জবার কর্তৃপক্ষকে আমি দিয়েছি, আমি কোন দুর্নীতি করি নাই।
Leave a Reply