লালমনিরহাট—বাংলাদেশের উত্তর সীমান্তের এক শান্ত শহর। অথচ সেই শান্ত শহরই রবিবার দুপুরে সাক্ষী হলো তথ্যের অধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর বর্বর হামলার।

তিন সাংবাদিক—আরটিভির প্রতিনিধি মিজানুর রহমান মিজান, ক্যামেরাপার্সন আরিফুল ইসলাম এবং স্থানীয় এক সাংবাদিক—তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে লাঞ্ছিত হলেন একটি বেসরকারি সংস্থা, ইএসডিও (ESDO)-র কার্যালয়ে।
তথ্য চাইতে গিয়েছিলেন, পেলেন লাঞ্ছনা।
ক্যামেরা তুলতে চেয়েছিলেন, পেলেন ধাক্কা আর ঘুষি।
এটাই এখন আমাদের তথাকথিত “স্বচ্ছতা”র চিত্র!

তথ্যের পথে প্রাচীর: কে দেবে জবাব?
সংবাদকর্মীরা অভিযোগ করেছেন—তারা ইএসডিও কার্যালয়ে গেলে কর্মকর্তারা তথ্য দিতে গড়িমসি করেন। কিন্তু ভিডিও ধারণ শুরু করলে আচমকাই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। এক পর্যায়ে কর্মচারীরা ধাক্কা দিয়ে সাংবাদিকদের অফিস থেকে বের করে দেন, মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টাও হয়, আর ক্যামেরাপার্সন আরিফুল ইসলাম সরাসরি হামলার শিকার হন।
এমনকি যারা সংবাদমাধ্যমে কাজ করেন—তাদের জানানো হয়, “এই অফিসে সাংবাদিকের জায়গা নেই।”
প্রশ্ন জাগে—তথ্য-সংগ্রহে বাধা দেওয়া কি আইনত অপরাধ নয়? তাহলে এখন অপরাধীরা এমন নির্ভয়ে সাংবাদিককে মারতে পারে কেন?
বাংলাদেশে ‘তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯’ সাংবাদিক, নাগরিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য তথ্য পাওয়ার সাংবিধানিক পথ উন্মুক্ত করেছে। কিন্তু লালমনিরহাটের এই ঘটনায় প্রমাণিত হলো—আইন আছে, প্রয়োগ নেই।
যেখানে তথ্য দেওয়া তো দূরের কথা, সেখানে সাংবাদিককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হচ্ছে, সেটাও দিবালোকের মতো খোলা জায়গায়।

আরও ভয়ঙ্কর হলো প্রশাসনের নীরবতা।
ওসি নুরনবী জানিয়েছেন, “অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে, তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” প্রশ্ন হলো—তদন্তের নামে সময়ক্ষেপণ কেন? সাংবাদিক পেটানো এখন তদন্তের বিষয় হয়ে গেছে?
সাংবাদিকতার মর্যাদা নাকি অপরাধ?
বাংলাদেশ প্রেসক্লাব রংপুর বিভাগের সভাপতি এস.আর. রতনের ভাষায়,“২৪ ঘণ্টার মধ্যে দোষীদের গ্রেপ্তার না হলে বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হবে।”
এটাই বাস্তবতা—সংবাদকর্মীদের এখন নিজেদের অধিকারের জন্যও আন্দোলনে নামতে হয়। যে দেশে সত্য বলা বিপজ্জনক, যে দেশে প্রশ্ন করলেই হামলার শিকার হতে হয়, সে দেশে “তথ্য অধিকার” আর “স্বাধীন গণমাধ্যম” শব্দদুটি কেবল ফাইলের পাতায় বেঁচে থাকে।
এই নীরবতা ভাঙতেই হবে:
গণমাধ্যম কোনো শত্রুপক্ষ নয়। সাংবাদিক প্রশ্ন করে, জবাব চায়—কারণ সেটাই তার কাজ। আর যে সমাজে প্রশ্ন করা অপরাধ, সেই সমাজ ধীরে ধীরে অন্ধকারে তলিয়ে যায়।
লালমনিরহাটের এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—
এটা বাংলাদেশের প্রতিটি জেলার সাংবাদিকদের নিত্যদিনের ভয়, আতঙ্ক আর বাস্তবতা।

সরকার, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থা—তিন পক্ষই যদি নীরব থাকে, তাহলে এই নীরবতা একদিন ‘সত্য হত্যার সংস্কৃতি’ হয়ে উঠবে।
সাংবাদিক মারধর মানে গণতন্ত্রে আঘাত। তথ্য লুকানো মানে দুর্নীতি রক্ষা। আর নীরব থাকা মানে অন্যায়ের সহায়তা। ভয় নয়, জবাব চাওয়া। সত্য নয়, গোপনীয়তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া।
লেখক: রাশেদুল ইসলাম রাশেদ
সাংবাদিক ও শিক্ষক
Leave a Reply