তাহমিনা আক্তার, ঢাকা: দেশের অনিবন্ধিত কিন্ডারগার্টেনগুলোকে আগামী শিক্ষাবর্ষে সরকারি বিনামূল্যের পাঠ্যবই থেকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে নিবন্ধন সম্পন্ন না করলে কোনো অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান সরকারি গুদাম থেকে এক কপি বইও তুলতে পারবে না—এমন কঠোর বার্তা দিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার।

৬০ হাজারের মধ্যে নিবন্ধিত মাত্র ২০% :
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৬০ হাজার কিন্ডারগার্টেন রয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ১০ থেকে ১২ হাজার প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন সম্পন্ন করেছে। অর্থাৎ প্রায় ৮০ শতাংশ কিন্ডারগার্টেন এখনও নিবন্ধনের বাইরে।
নিবন্ধনে গড়িমসির কারণ:
নীতিমালায় জমি, খেলার মাঠ, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার মতো কঠোর শর্ত রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান ভাড়া করা বাড়ি বা টিনশেডে চলছে, ফলে জমি বা মাঠের শর্ত পূরণে অক্ষম। কেউ কেউ নিবন্ধন ফি, নবায়ন ফি এবং ‘সংরক্ষণ তহবিল’ জমা দেওয়ার আর্থিক চাপের কথাও বলছে।
মিরপুরের একটি কিন্ডারগার্টেনের মালিক নাজমুল হক বলেন, “আমরা ভাড়া করা ভবনে স্কুল চালাই। জমি বা মাঠ তৈরি করার সামর্থ্য নেই। বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তাও নেই।”

শিক্ষাবিদদের মতামত:
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব প্রতিষ্ঠানের সরকারি নিবন্ধন থাকাটা যৌক্তিক, কারণ তাতে মান, পাঠ্যক্রম, অর্থব্যয় ও শিক্ষার স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, “শিশু যে ধারার শিক্ষা নিক, প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধন থাকা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।”
নিবন্ধনের শর্ত ও খরচ :
• ২০২৩ সালের নীতিমালা অনুযায়ী—
• পাঠদানের অনুমতি: ২–৫ হাজার টাকা।
• নিবন্ধন ফি: ৮–১৫ হাজার টাকা।
• নবায়ন ফি: ৪–৭.৫ হাজার টাকা।
• ‘সংরক্ষণ তহবিল’: উপজেলা শহরে ২৫ হাজার, জেলা শহরে ৭৫ হাজার, বিভাগীয় শহরে ১ লাখ (ব্যক্তিমালিকানায় ৫ লাখ)।
• বিভাগীয় শহরে জমি থাকতে হবে ০.৮ শতক, জেলা শহরে ০.১২ শতক, উপজেলা শহরে ০.৩০ শতক।
• শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ৩০:১ বজায় রাখা বাধ্যতামূলক।
বই বিতরণের সময়সীমা ও বঞ্চনার বাস্তবতা:
সরকারি নিয়মে জানুয়ারির প্রথম দিন শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দিতে ডিসেম্বরের ২০ থেকে ২২ তারিখের মধ্যেই দেশের সব স্কুলে বই পৌঁছে দেওয়া হয়। অর্থাৎ ডিসেম্বরের মধ্যেই নিবন্ধন না করলে অনিবন্ধিত স্কুলগুলোতে বই যাবে না। ফলস্বরূপ, জানুয়ারিতে ওইসব স্কুলের শিক্ষার্থীরা সরকারি বিনামূল্যের বই হাতে পাওয়ার সুযোগই হারাবে।
মাননিয়ন্ত্রণ ও শাস্তির হুঁশিয়ারি:
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার বলেন, “নীতিমালার লক্ষ্য সব প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধনের আওতায় এনে শিক্ষার মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। নিবন্ধন ছাড়া আগামী বছর কোনো স্কুল সরকারি পাঠ্যবই পাওয়ার স্বপ্নও দেখতে পারবে না।”

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ সতর্ক করে বলেন, নিবন্ধনবিহীন স্কুলে মাননিয়ন্ত্রণ না থাকায় শিশুদের সৃজনশীলতা ও জ্ঞানচর্চা ঝুঁকির মুখে পড়ে। কেউ কেউ অতিরিক্ত বই চাপাচ্ছে, আবার কেউ কেবল পরীক্ষামুখী শিক্ষা দিচ্ছে। তিনি ৩ থেকে ৫ বছরের ধাপে ধাপে শর্তপূরণের রোডম্যাপ করার পরামর্শ দেন।
প্রবা/তাহমিনা আক্তার
Leave a Reply