অনলাইন ডেস্ক: সারা দেশে হামে আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুর মিছিল ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হাম সন্দেহে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গেল ৩৮ দিনে হাম সন্দেহে ১৯০ জনের মৃত্যু হলো। এছাড়া নিশ্চিত হামে ৩৮ জন মারা গেছে বলে স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে। এ হিসাবে হামে দিনে গড়ে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গযুক্ত সন্দেহভাজন রোগী পাওয়া গেছে এক হাজার ২২৯ জন এবং নিশ্চিত রোগী চিহ্নিত হয়েছে ১২৯ জন। বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, সরকারিভাবে হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর যে তথ্য দেওয়া হচ্ছে তাতে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও বাড়িতে মৃত্যুর তথ্য নেই। ফলে আক্রান্ত-মৃত্যু আরও বেশি হলেও তা জানা যাচ্ছে না। তাদের দাবি, চাহিদা অনুপাতে হামের টিকা মজুত না থাকা, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ সংকট, জনবল ঘাটতি, কর্মসূচিতে নজরদারির অভাব, টিকাদান কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ এবং নিয়মিত ক্যাম্পেইন না হওয়ার কারণে হাম ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ৯ মাসের কম বয়সিদের শরীরে হাম সংক্রামিত হওয়ায় অভিভাবক-স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী দেশে ১৫ মার্চ থেকে ২২ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত সন্দেহজনক হামরোগীর সংখ্যা ২৭ হাজার ১৬৪ জন এবং নিশ্চিত হামরোগীর সংখ্যা তিন হাজার ৯৩৪ জন। একই সময়ে সন্দেহজনক হাম রোগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৭ হাজার ৯৯৮ জন। সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১৪ হাজার ৮৯২ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতিদিন গড়ে প্রায় হাজারের মতো শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। কিন্তু দেশে হামের নমুনা পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে কেবল মহাখালীর জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ল্যাবে। গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পরের মাসে হামের প্রকোপ দেখা দেয়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে ও লক্ষণ নিয়ে অনেক মৃত্যুর খবর আসতে থাকে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এ পরিস্থিতির জন্য আগের দুই সরকার দায়ী। এজন্য মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ও সদ্যবিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করেছেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন অভিযোগ করেছেন, গত আট বছরে দেশে হামের কোনো টিকাই দেওয়া হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়, শিশুদের হামের টিকার ব্যবস্থা না করে বিগত দুই সরকার ‘ক্ষমাহীন অপরাধ’ করেছে। আগের দুই সরকারের দায় থাকলেও বর্তমান সরকারের মধ্যেও ‘আন্তরিকতার’ ঘাটতি দেখছেন কেউ কেউ।
দেশের স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি ও জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনার মানোন্নয়নের একটি বড় কর্মসূচি এইচপিএনএসপি। এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হতো ‘অপারেশন প্ল্যান’ বা ‘ওপির’ মাধ্যমে। ইপিআই কর্মকর্তারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘ওপি’ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় এক ধরনের ধস নামে। দেশের টিকা কার্যক্রমে ভাটা পড়ে, জীবনরক্ষাকারী ওষুধের ঘাটতি, মাঠপর্যায়ে কর্মীদের বেতন বন্ধ-সব মিলিয়ে জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ে যায়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম বারী বলেন, সম্প্রতি হাম রোগের প্রাদুর্ভাবের পেছনে টিকাদানের কভারেজ কমে যাওয়া এবং সংশ্লিষ্ট সেবা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর ঘাটতি প্রধান ভূমিকা রাখছে। এজন্য নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি শক্তিশালী করা এবং টিকাদান কার্যক্রমের প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করা অত্যন্ত জরুরি।
বুধবার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন দেশের হাম পরিস্থিতি ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ তুলে ধরেন। এ সময় তিনি বলেন, বিগত সরকারের ব্যর্থতার কারণে হামের টিকার মজুত শূন্য ছিল। এই সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ৬৮ দিনের মধ্যে ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, গ্যাভিসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতায় টিকা সংগ্রহ করে তা সারা দেশে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। ৫ এপ্রিল থেকে ১৮টি জেলা ও ৩০টি উপজেলায় এই কার্যক্রম শুরু হয়। এছাড়া ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ, ময়মনসিংহ এবং বরিশাল শহরেও ভ্যাকসিন দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করেছি। এই মাসের ২০ এপ্রিল থেকে এই কার্যক্রম সারা দেশে শুরু হয়
Leave a Reply