বিজ্ঞাপন:
সংবাদ শিরোনাম:
৫ বছরের শিশুকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যা, ২ আসামি কারাগারে সমুদ্র অথবা ব্রহ্মপুত্র: এন এইচ আশিক তিন দিন ধরে রৌমারী সীমান্তের শূন্যরেখায় ৬ জন, উৎকণ্ঠায় স্বজনরা ধারের টাকা পরিশোধ না করায় জামায়াত কর্মীকে হত্যা, গ্রেপ্তার ৩ স্ত্রীর পরকীয়া দেখে ফেলায় যুবককে শ্বশুরবাড়িতে ডেকে নিয়ে হত্যার অভিযোগ বিষপান করে প্রেমিকের বাড়িতে গিয়ে অসুস্থ স্কুলছাত্রী, হাসপাতালে মৃত্যু মহাসড়কে দায়িত্ব পালনের সময় ট্রাকচাপায় প্রাণ গেল পুলিশ সদস্যের লালমনিরহাটে ৭ বছরের শিশুকে হত্যা: ডিসি-এসপির গাড়ি ভাঙচুর,ওসি ক্লোজড, আহত ১৮ পুলিশ পরীমণিকাণ্ডে চাকরি হারাচ্ছেন সেই এডিসি সাকলায়েন সুন্দরগঞ্জে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান, ইয়াবা-গাঁজাসহ দুই মাদক কারবারি গ্রেপ্তার
তিন দিন ধরে রৌমারী সীমান্তের শূন্যরেখায় ৬ জন, উৎকণ্ঠায় স্বজনরা

তিন দিন ধরে রৌমারী সীমান্তের শূন্যরেখায় ৬ জন, উৎকণ্ঠায় স্বজনরা

ডেস্ক রিপোর্ট :: কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে পুশইনচেষ্টার শিকার হয়ে নারী ও দুই শিশুসহ ৯ জন তিন দিন ধরে আন্তর্জাতিক শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন। খোলা আকাশের নিচে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটানো এই ৯ জনের মধ্যে ছয়জনের বাড়ি ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলায়। বাড়ি থেকে রাগ করে দালালের খপ্পরে পড়ে তারা ভারতে পাড়ি জমিয়েছিলেন। পরে গুয়াহাটিতে পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও যথাযথ নিয়ম অনুসরণ না করে রাতের অন্ধকারে তাদের বাংলাদেশে পুশইন করার চেষ্টা করা হয়। বর্তমানে শূন্যরেখায় আটকে থাকায় চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন তাদের স্বজনরা।

শূন্যরেখায় অবস্থান করা ছয়জন হলেন ভালুকা উপজেলার বিরুনিয়া ইউনিয়নের কংশেরকূল গ্রামের রুপ মিয়ার ছেলে বিল্লাল হোসেন (২৮), তার স্ত্রী সুমি আক্তার (২৭), তাদের চার বছর বয়সী মেয়ে ফাতেমা ও ছয় মাস বয়সী মেয়ে ফাহিমা। এ ছাড়া, রয়েছেন বিল্লালের মায়ের মামাতো ভাইয়ের ছেলে হিমেল মিয়া (২০) এবং বিরুনিয়া কাইচান কশাইপাড়া এলাকার রিটন মিয়ার ছেলে সজিব মিয়া (২৫)।

বিজিবি ও সীমান্তে আটকে থাকা ব্যক্তিদের স্বজনদের সূত্রে জানা গেছে, গত ৬ জুন দলটি এলাকা ছাড়ে। পরে তারা সিলেটের একটি মাজারে গিয়ে অবস্থান করেন। এরপর ৯ জুন সেখানকার এক দালালের মাধ্যমে ভারতে চলে যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে গুয়াহাটি পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। এ ঘটনায় ১২ জুন আসাম নিউজ নামের একটি অনলাইনেও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল।

স্থানীয় সূত্র ও বিজিবি জানায়, গত রোববার ভোরে ভারতের ঝালুরচর বিএসএফ ক্যাম্পের সদস্যরা এক নারী, তিন পুরুষ ও দুই শিশুসহ ছয়জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার শৌলমারী ইউনিয়নের গয়টাপাড়া সীমান্তের আন্তর্জাতিক ১০৬০ নম্বর মেইন পিলারের ১ নম্বর সাব-পিলার এলাকার শূন্যরেখায় তারা অবস্থান করছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের বাধা এবং বিজিবির সতর্ক অবস্থানের কারণে তারা বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি। এরপর থেকেই তারা আন্তর্জাতিক সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন।

বর্তমানে তাদের চারপাশে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া সামান্য খাবার ও পানি খেয়ে দিন কাটছে তাদের। ঘটনার পর রোববার দুপুরে বিজিবি ও বিএসএফের কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে জরুরি পতাকা বৈঠক হলেও কোনো সমাধান হয়নি।

সীমান্তরেখায় আটকে থাকা সজিব মিয়ার বাড়ি বিরুনিয়ার কাইচান কশাইপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, তাকে ঘিরে পরিবারের উৎকণ্ঠার শেষ নেই। বাড়িতে রয়েছে মাটির একটি ঘর। পলিথিনের ছাপড়া ঘরে রান্না করছিলেন তার সৎমা ফাতেমা আক্তার। পাশেই দাদি রুমেনা খাতুন বারবার নাতিকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানাচ্ছিলেন। সজিবের জেলে বাবা একটি মৎস্য খামারে জাল টানতে যাওয়ায় তাকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি।

পরিবারের সদস্যরা জানান, সজিবের বয়স যখন সাত বছর, তখন তার মা তাকে রেখে অন্যত্র বিয়ে করেন। পরে বাবা রিটন দ্বিতীয় বিয়ে করেন। সজিব শারীরিক ও মানসিকভাবে ততোটা সুস্থ নয়। প্রায় তিন বছর আগে ভালুকা পৌরসভার গ্যাস অফিস এলাকায় রিয়া আক্তার নামে এক নারীকে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে মারিশা আক্তার নামে ১৮ মাস বয়সী একটি সন্তান রয়েছে। স্ত্রীর সঙ্গে শ্বশুরবাড়িতে থাকলেও গত ৬ জুন দাদির বাড়িতে যায় সজিব। সেখানে সে দাদির কাছে ভারতে যাওয়ার জন্য ১ হাজার ৫০০ টাকা চেয়েছিল। এলাকার বিল্লাল তাকে কাজ দেওয়ার কথা বলে ভারতে নিয়ে যেতে চাইলে দাদি টাকা দেননি।

সজিবের দাদি রুমেনা খাতুন বলেন, `১৫শ টেহা চাইছিন নাতি দিছি না কইরা রাগ করছে। ভারতে গিয়ে ভাঙ্গারি ব্যবসার করার কথা বলে আমার নাতিরে নিয়ে যায় বিল্লাল। বাড়ি থেকে যাওয়ার সময় আমাদের বলেও গেছে না। পরে মাইনস্যে কইছে আমার নাতি ধরা পড়ছে সীমান্তে। আমরারে খবর দিছে পরে কাগজপত্র পাঠাইছি। টেহার লাগি একজন গার্জেন পাডাইতে পারতাছি না। আমার নাতিডারে দেশে ফিরাইয়া দেন।‘

সজিবের সৎমা ফাতেমা আক্তার বলেন, `শনিবার (৬ জুন) বাড়ি থাইকা যাওনের পরদিন ফোন কইরা কইছে সিলেটের একটা মাজার আছে। পরে আর আমরা কোনো খোঁজ জানি না। হঠাৎ আমরা টিভিতে খবরে দেখলাম আমার ছেলে সীমান্তে আটকা পড়ছে। আমরা এমন গরিব মানুষ টেহা নাই যে হেইন যাইবাম ছেলেরে দেখতাম। ছেলে যে এরকম করে যাইবগা আমরা জানিও না।‘

তিনি আরও বলেন, `মানুষ বলতেছে, তারে (সজিব) বলে মাইরা ফালাইয়া দিব। তারা এমন পাহাড়ের ভেতরে রাখছে, খাদ্য নাই, পোকা-মাকড়রার কামড়াইতাছে। আপনেগো কাছে আমার একটাই অনুরোধ, আমার সন্তানটা আপনারা ফিরে দিবেন।‘

১৮ মাস বয়সী মেয়েকে নিয়ে উৎকণ্ঠায় রয়েছেন স্ত্রী রিয়া আক্তার। তিনি বলেন, `বাচ্চা বাপের লাইগা কান্দে না। দালালের পাল্লাত পইড়া আমার স্বামী গেছে। আমি চাই আমার স্বামী দ্রুত দেশে নিয়া আসুক।‘

উপজেলার বিরুনিয়া ইউনিয়নের কংশেরকূল গ্রামে বিল্লাল হোসেনের বাড়ি। সীমান্তের শূন্যরেখায় স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে আটকা পড়েছেন তিনি। তার সঙ্গে রয়েছেন তাদের স্বজন হিমেল মিয়া।

মঙ্গলবার দুপুর ২টার দিকে বিল্লালের বাড়িতে গিয়ে তার মা হাসনা খাতুনের সঙ্গে কথা হয়। সীমান্তে সন্তান আটকে থাকার খবর পেয়ে স্থানীয় গ্রাম পুলিশের এক সদস্যকে নিয়ে সোমবার রৌমারী উপজেলার শৌলমারী ইউনিয়নের গয়টাপাড়া সীমান্তে গিয়েছিলেন তিনি। পরে সোমবার রাতেই সেখান থেকে ফিরে আসেন। সন্তান ও ছোট নাতনিদের অবস্থা দেখে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার অনুরোধ জানান তিনি।

হাসনা খাতুন বলেন, `গত রোজার ঈদের পর থেকে আমার কাছে ৫০ হাজার টাকা চাইতাছিন অটোরিকশা কিইন্যা দেওনের লাগি। কিন্তু কিস্তি দিয়াম কিবায় এর লাগি সমিতি থাইকা টেহা তুইলা দেইনাই। টেহা দেইনাই কইরা রাগ কইরা বউ পোলাপান লইয়া বাড়িত থাইকা গেছে গা। আমার এক ভাইস্তারেও লগে লইয়া গেছে। শনিবার (৬ জুন) বাড়ি থাইকা সিলেট গিয়া দুই দিন মাজার আছিন। পরে হেইনের এক দালালে ভারত লইয়া গেছে।‘

তিনি আরও বলেন, `সরকারের উপর মহল থাইকা সমাধান না অইলে আমার ছেলেরে দিত না কইছে। হের লাগি বাড়ি আয়া পড়ছি। অহন কী হয় দেহি।‘

বিরুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছামছুল হোসাইন বলেন, আমার এলাকার নারী শিশুসহ ছয়জন সীমান্তে আটকা আছে। কাজের আশায় ভারতে পারি জমানে ছেলে গুলো খুবই গরিব পরিবারের। তারা সমাজের স্বাভাবিক পরিবারে বেড়ে উঠেনি। কারও মা নেই, কিংবা বাবা নেই। তাদেরকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বিষয়। আমাদের পক্ষ থেকে যতটুকু সহযোগিতা দরকার সার সবটুকু করা হবে।


বিজিবির ময়মনসিংহ সেক্টর কমান্ডার কর্নেল সরকার মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কুড়িগ্রাম সীমান্তের ভারতীয় অংশের ভেতরে যে ছয়জন আটকা আছে তাদের কোনো ঠিকানা ভারতীয় পক্ষ থেকে আমরা পাইনি। আমরা বিএসএফকে বলেছি পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা দাও আমরা যাচাই করি। তারপর আমরা যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করবো। ছয়জন ভারতের ভূমিতেই আছে এবং ভারতের দিক থেকেই তাদেরকে পুশইন করা হয়েছে। সেসংক্রান্ত ভিডিও ফুটেজও আমরা পাঠিয়েছি বিএসএফকে। তারা ভারতীয় পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর আসাম নিউজ নামে একটি অনলাইনে সংবাদও প্রকাশিত হয়। এখন তারা (বিএসএফ) অস্বীকারও করতে পারছে না যে ভারত থেকে পুশইন করেনি।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ওয়েবসাইট এর কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি।
Design & Development BY : ThemeNeed.com