মনজু হোসেন,স্টাফ রিপোর্টার: পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলায় এডিপি প্রকল্প বাস্তবায়নে চরম অনিয়ম ও অস্বাভাবিক ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের কাগজপত্রে দেখা যায়, ৮ হাজার টাকার একটি টেবিল ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার টাকা, ৪ হাজার টাকার চেয়ার ধরা হয়েছে ১১ হাজার ৩৫২ টাকা, আর সাড়ে ৫০০ টাকার একটি ফুটবল দেখানো হয়েছে এক হাজার ৩৩৩ টাকা।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে যেসব উপকরণ সহজেই সুলভ মূল্যে পাওয়া যায়, প্রকল্প বাস্তবায়নে তার দাম ধরা হয়েছে তিন থেকে চার গুণ বেশি। স্থানীয়দের অভিযোগ, যথাযথ নিয়ম-কানুন না মেনে এভাবে সরকারি অর্থে লুটপাট চলছে।
প্রশাসনের ব্যাখ্যা:
অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আফরোজ শাহীন খসরু বলেন— “প্রাক্কলন কোড অনুযায়ী একটি টেবিলের দাম ৬৮ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। আমরা তো এত টাকা দিইনি। প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া আমার কাজ, বাস্তবায়নের দায়িত্ব প্রকৌশল অফিসের।”

অন্যদিকে উপজেলা প্রকৌশলী মো. ইদ্রিস আলী খান দাবি করেন, “অনিয়ম করার কোনো সুযোগ নেই। প্রাক্কলনে যেভাবে উল্লেখ আছে, সেভাবেই কাজ সম্পন্ন হয়েছে।”
সরেজমিনে অনিয়মের প্রমাণ:
তেঁতুলিয়া এডিপি প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ৯টি টেবিল ও ৪২টি চেয়ার কেনার জন্য। কিন্তু সরেজমিনে পাওয়া গেছে মাত্র ৭টি টেবিল ও ৩০টি চেয়ার। স্থানীয় ফার্নিচার ব্যবসায়ীরা জানান, নির্দিষ্ট নকশা অনুযায়ী কাঠ ব্যবহার করলেও একটি টেবিল ও একটি চেয়ার সর্বোচ্চ ১২ হাজার টাকায় তৈরি সম্ভব। অথচ প্রকল্পে সেই ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় তিনগুণ বেশি।
কোটি টাকার কাজ নির্দিষ্ট ঠিকাদারের হাতে:
ইউএনও ও প্রকৌশল অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এডিপি বরাদ্দ ছিল প্রায় ৮৪ লাখ টাকা এবং রাজস্ব খাতে আরও ৩৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৫০ লাখ টাকার প্রকল্প কোটেশনের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ইউএনওর আস্থাভাজন এক ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকেই প্রায় ৪০ লাখ টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে।

টেনিস গ্রাউন্ডে ২০ লাখ, বেরং কমপ্লেক্সে ১০ লাখ, ইউএনও বাসভবন সংস্কারে ১০ লাখ এবং পিকনিক কর্নার স্কিমে আরও ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
তেঁতুলিয়া পিকনিক কর্নার প্রকল্পে শুধু নয়টি টেবিল ও ৪২টি চেয়ারের দাম ধরা হয় ৭ লাখ ৯১ হাজার ৭৮৪ টাকা। অথচ বাজারে একই আসবাব কিনতে খরচ হতো সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকার কিছু বেশি।
ঠিকাদারের দাবি:
এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হাসান এন্টারপ্রাইজ-এর মালিক হাসান বলেন— “কাজ যেভাবে ধরানো হয়েছিল, সেভাবেই করেছি। কাজ শেষে আমি আট লাখ পাঁচ হাজার টাকার বিল পেয়েছি।”

জনমনে ক্ষোভ:
এডিপি প্রকল্পে এ ধরনের অস্বাভাবিক ব্যয় ও অনিয়ম নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, উন্নয়নের নামে এই ধরনের দুর্নীতি বন্ধ না হলে সাধারণ মানুষের করের টাকায় উন্নয়নের স্বপ্ন কখনোই পূরণ হবে না।
প্রবা/আরইসআর
Leave a Reply