গাইবান্ধা প্রতিনিধি: গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলায় খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ডিলার নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা মমিনুর রশিদ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে। অভিযোগ ওঠার পর থেকেই তিনি কর্মস্থল ত্যাগ করে ‘গা ঢাকা’ দিয়েছেন। ঘটনাটি জানাজানি হতেই ফুঁসে উঠেছে স্থানীয় ব্যবসায়ী সমাজ ও সচেতন মহল।

সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি উপজেলার আটটি ইউনিয়নে ২১ জন ডিলার নিয়োগের জন্য একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে মোট ১২টি শর্ত উল্লেখ করে আবেদনপত্র জমাদানের সময় নির্ধারণ করা হয় ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে ৫ মার্চ পর্যন্ত। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মোট ৮৮টি আবেদন জমা পড়ে।
বিজ্ঞপ্তির ২ নম্বর শর্তে উল্লেখ ছিল প্রত্যেক আবেদনকারীর কমপক্ষে ১৫ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য সংরক্ষণের সক্ষমতা ও একটি পাকা গুদামঘর থাকতে হবে। অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ আবেদনকারীর গুদামঘর এই শর্ত পূরণে অক্ষম ছিল।
নিয়ম অনুযায়ী, যেসব বিক্রয় কেন্দ্রে একাধিক আবেদন পড়ে, সেখানে লটারির মাধ্যমে প্রার্থী নির্বাচন করার কথা থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মমিনুর রশিদ সিদ্দিকী রাতের আঁধারে পছন্দের তালিকা তৈরি করে ৯ জুলাই স্বাক্ষর করেন এবং ১৩ জুলাই তা প্রকাশ করেন।

চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো এই তালিকা অনুমোদনের সময় কমিটির সভাপতি ও একাধিক সদস্যকে না জানিয়ে একক সিদ্ধান্তে তা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এতে করে একাধিক ভুয়া নাম, প্রভাবশালীদের আত্মীয়স্বজন ও এমনকি ব্যবসায়ী নন এমন ব্যক্তিরাও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এতে করে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
তালিকা প্রকাশের পর বঞ্চিত আবেদনকারীরা উপজেলা খাদ্য অফিস ঘেরাও করে স্বচ্ছ লটারির দাবিতে বিক্ষোভ করেন। ওইদিন সন্ধ্যায় খাদ্য কর্মকর্তা ১৪ জুলাই সকাল ১১টায় লটারি আয়োজনের একটি নোটিশ তৈরি করলেও তা স্বাক্ষর না করে ‘অজ্ঞাত কারণে’ গা ঢাকা দেন।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, একটি ‘অজ্ঞাত ফোনকল’ ও স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর মধ্যস্থতায় আরও ৮ জনকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার শর্তে আপসের পরিকল্পনা হয়। এরপর থেকেই মমিনুর রশিদ সিদ্দিকী অফিসে অনুপস্থিত।
এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে অন্তত ১৫-১৬ জন আবেদনকারী লিখিত অভিযোগ নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার শরণাপন্ন হয়েছেন। তাঁরা লটারির মাধ্যমে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে পুনরায় নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন, অন্যথায় আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল আলম বলেন, “মোট ৮৮টি আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ২২টি বৈধ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। শুনেছি ২১ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তবে এখনো প্রক্রিয়া শেষ হয়নি।”
খাদ্য কর্মকর্তা মমিনুর রশিদ সিদ্দিকী স্বীকার করে বলেন, “প্রথম পর্যায়ে ২১ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে সমঝোতার ভিত্তিতে আরও ৮ জনের তালিকা হয়েছে, যা কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত করা হবে।”
তবে নিয়োগ কমিটির সদস্য ও সমাজসেবা কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান বলেন, “মূল সিদ্ধান্ত সভাপতি ও সদস্য সচিব নেন। অন্যান্য সদস্যদের মতামতের তেমন গুরুত্ব নেই।”
কমিটির আরেক সদস্য ও প্রেসক্লাব সভাপতি শাহ আলম সরকার জানান, “আমাকে কমিটিতে রাখা হলেও কিছুই জানানো হয়নি। পুরো প্রক্রিয়া থেকে আমি সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ছিলাম।”

এ বিষয়ে পলাশবাড়ী উপজেলা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম লিয়াকত বলেন, “খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি জনসংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এখানে কোনো ধরনের গোপনীয়তা ও অনিয়ম গ্রহণযোগ্য নয়। তদন্ত কমিটি গঠন করে লটারির মাধ্যমে নতুন করে নিয়োগ দিতে হবে।”
জনস্বার্থে ১৭ জুলাই ২০২৫ তারিখে পলাশবাড়ী উপজেলা নাগরিক স্বার্থ সংরক্ষণ কমিটির পক্ষ থেকে সদস্য সচিব ও সাংবাদিক মো. ফেরদাউস মিয়া খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দপ্তরে লিখিত অভিযোগ পাঠিয়েছেন।
স্থানীয় সচেতন মহল এই অনিয়ম ও দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং লটারির মাধ্যমে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নিয়োগের দাবি জানিয়েছে। অন্যথায় জনসাধারণের মাঝে ক্ষোভ ও অসন্তোষ আরও ঘনীভূত হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা।
Leave a Reply