বেতন বাড়ানো শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি একটি দেশের অর্থনীতি, রাজস্ব কাঠামো, মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি বড় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত। তাই নতুন পে স্কেল ঘোষণার পর সরকারি চাকরিজীবীদের স্বস্তির পাশাপাশি অর্থনীতির ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও আলোচনা জরুরি।

২০২৬ সালের জাতীয় পে স্কেলে ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন কাঠামো ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে। তবে এর বাস্তবায়ন হবে ধাপে ধাপে। প্রায় ২৪ লাখ সরকারি ও সামরিক কর্মচারী এবং ৯ লাখের বেশি অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য সুবিধাভোগী এর আওতায় আসবেন। সরকারের হিসাবে অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।
আরো পড়ুন: সমুদ্র অথবা ব্রহ্মপুত্র: এন এইচ আশিক
এখানেই মূল প্রশ্ন। এই বিপুল অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান হবে কোথা থেকে?

সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। বরং দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের সীমিত আয় বিবেচনায় বেতন পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা ছিল। বিশেষ করে ১০ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির ফলে তাদের প্রকৃত জীবনমান কিছুটা উন্নত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে, এই বাড়তি ব্যয় যেন রাজস্ব ব্যবস্থার ওপর অসহনীয় চাপ সৃষ্টি না করে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি হলো তুলনামূলকভাবে কম রাজস্ব আয়। সরকারের ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে কর ও রাজস্ব আয় বাড়ছে না। ফলে বেতন, পেনশন, ভর্তুকি, সুদ পরিশোধ এবং অন্যান্য আবশ্যিক ব্যয় মেটাতে সরকারকে ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়। নতুন পে স্কেল এই চাপ আরও বাড়াতে পারে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মূল্যস্ফীতি। ২০২৬ সালের জুনে দেশে পয়েন্ট টু পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৬১ শতাংশ। অর্থাৎ মানুষের আয় বাড়লেও বাজারে পণ্য ও সেবার দাম যদি একই সঙ্গে বাড়তে থাকে, তাহলে বেতন বৃদ্ধির একটি অংশ বাস্তব ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির বদলে মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতেই চলে যেতে পারে।
তবে এখানেও একটি ভারসাম্যের বিষয় রয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়লে তাদের ভোগব্যয় বাড়বে। তারা বাজারে বেশি পণ্য ও সেবা কিনবেন। এতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়তে পারে, ব্যবসা ও উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা অতিরিক্ত আয়ের বড় অংশই সাধারণত খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, পোশাক ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে ব্যয় করেন। ফলে এই অর্থের একটি বড় অংশ আবার অর্থনীতির ভেতরেই ফিরে আসবে।
কিন্তু উৎপাদন যদি সেই বাড়তি চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়তে না পারে, তাহলে সমস্যা তৈরি হবে। মানুষের হাতে টাকা বাড়ল, কিন্তু বাজারে পণ্য ও সেবার সরবরাহ একই রকম থাকল। তখন চাহিদার চাপ দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই পে স্কেলের সঙ্গে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।

আরেকটি বিষয় হলো বেসরকারি শ্রমবাজার। সরকারি চাকরিতে বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধি হলে বেসরকারি খাতেও কর্মীদের বেতন ও সুযোগ সুবিধা নিয়ে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হতে পারে। এটি একদিকে শ্রমিকদের জন্য ইতিবাচক। অন্যদিকে উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। সেই চাপ যদি পণ্যের দামে স্থানান্তরিত হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাকেই অতিরিক্ত মূল্য দিতে হবে।
পে স্কেলের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো নিম্ন আয়ের সরকারি কর্মচারীদের তুলনামূলক বড় হারে বেতন বৃদ্ধি। সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা হওয়া নিঃসন্দেহে বড় পরিবর্তন। কিন্তু একজন কর্মচারীর বেতন কত শতাংশ বেড়েছে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই বেতন দিয়ে তিনি বাস্তবে কতটা জীবনযাপন করতে পারছেন। পাঁচ বছর আগে যে আয় দিয়ে একটি পরিবারের নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয় মেটানো যেত, আজ একই আয় দিয়ে যদি তার অর্ধেকও সম্ভব না হয়, তাহলে কাগজে বেতন বৃদ্ধি আর বাস্তব জীবনের স্বস্তি এক বিষয় নয়।
এই কারণে পে স্কেলকে শুধু বেতন বৃদ্ধির নীতি হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে অর্থনৈতিক সংস্কারের একটি অংশ হিসেবেও দেখতে হবে।
সরকারকে একই সঙ্গে করের আওতা বাড়াতে হবে, কর ফাঁকি কমাতে হবে, রাজস্ব প্রশাসনকে আধুনিক করতে হবে এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়াতে হবে। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে না পারলে নতুন বেতন কাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ সামলানো কঠিন হবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, কর সংস্কার এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
পে স্কেল বাস্তবায়ন দুই অর্থবছরে ধাপে ধাপে করার সিদ্ধান্ত তাই অর্থনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। এতে সরকারের ওপর একবারে বড় ধরনের ব্যয়ের চাপ পড়বে না। একই সঙ্গে রাজস্ব আয় ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবায়নের সুযোগ থাকবে।
তবে শুধু ধাপে বাস্তবায়ন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা। আজ বেতন বাড়ানো হলো, আগামী কয়েক বছর পর আবার মূল্যস্ফীতি বাড়ল, তারপর আবার নতুন পে স্কেলের দাবি উঠল। এভাবে চলতে থাকলে রাষ্ট্রকে বারবার একই ধরনের আর্থিক চাপের মুখোমুখি হতে হবে।
তাই ভবিষ্যতের বেতন কাঠামোকে একটি নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক সূচকের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টি ভাবা যেতে পারে। মূল্যস্ফীতি, উৎপাদনশীলতা, রাজস্ব আয় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মতো সূচক বিবেচনায় নিয়ে নিয়মিত পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকলে হঠাৎ করে বড় ধরনের বেতন পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজন কমে আসতে পারে।

পে স্কেল কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নয়। বরং সময়ের বাস্তবতায় এটি প্রয়োজনীয় একটি সিদ্ধান্ত। কিন্তু একটি ভালো সিদ্ধান্তও ভুল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার কারণে সমস্যার কারণ হয়ে উঠতে পারে। বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি যদি রাজস্ব আয় বাড়ানো যায়, উৎপাদন বাড়ানো যায়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এবং সরকারি ব্যয়ের অপচয় কমানো যায়, তাহলে পে স্কেল অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক শক্তি হতে পারে।
অন্যদিকে রাজস্ব আয় না বাড়িয়ে ঋণনির্ভর ব্যয় বাড়ানো হলে, উৎপাদন না বাড়িয়ে মানুষের হাতে অতিরিক্ত অর্থ তুলে দিলে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে সেই বেতন বৃদ্ধির প্রকৃত সুফল দ্রুত কমে যেতে পারে।
শেষ পর্যন্ত পে স্কেলের সাফল্য শুধু বেতন স্লিপে কত টাকা বাড়ল, তা দিয়ে বিচার করা যাবে না। বিচার করতে হবে একজন সরকারি কর্মচারীর বাড়তি আয়ে তার পরিবারের বাজারের ব্যাগ কতটা ভরল, সন্তানের শিক্ষা কতটা নিরাপদ হলো, চিকিৎসার ব্যয় কতটা সামলানো গেল এবং মাস শেষে তার হাতে কতটা স্বস্তি থাকল, তা দিয়ে।

রাষ্ট্রের সামনে তাই প্রশ্নটি শুধু বেতন বাড়ানোর নয়। প্রশ্ন হলো, সেই বাড়তি বেতন কীভাবে অর্থনীতির উৎপাদনশীলতার সঙ্গে যুক্ত হবে এবং কীভাবে একটি টেকসই আর্থিক কাঠামোর মধ্যে রাখা যাবে।
পে স্কেল মানুষের আয় বাড়িয়েছে। এখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সেই আয়ের ক্রয়ক্ষমতাও রক্ষা করা।
কারণ বেতন বাড়লেই স্বস্তি আসে না। স্বস্তি আসে তখনই, যখন বাড়তি আয়ের সঙ্গে বাজারের দৌড়ও থেমে আসে।
লেখক: এন এইচ আশিক
শিক্ষক ও সংগঠক
(মুক্তমতামত বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
Leave a Reply