তাহমিনা আক্তার,ঢাকা: মাত্র আড়াই মাসে দেশে হামে প্রায় পাঁচশ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো গণটিকা কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে এসব মৃত্যুর বড় অংশই প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল। তাদের অভিযোগ, পরপর তিন সরকারের অবহেলা, সমন্বয়হীনতা এবং জনস্বাস্থ্য বিষয়ে সিদ্ধান্তহীনতার কারণেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, পতিত আওয়ামী লীগ সরকার স্বাস্থ্য খাতের সেক্টর প্রোগ্রাম বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারও বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত না করেই তা বাতিল করে দেয়। একই সঙ্গে কয়েক দফা পিছিয়ে যায় হামের গণটিকা ক্যাম্পেইন। জানুয়ারিতে সংক্রমণ শুরু হলেও দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। পাশাপাশি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত হাই-ফ্লো অক্সিজেন, ভেন্টিলেটর, আইসিইউ, পিআইসিইউ, শয্যা ও আইসোলেশন সুবিধাও নিশ্চিত করা যায়নি। জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, স্বাস্থ্য খাতের এই ধারাবাহিক অব্যবস্থাপনাই শিশু মৃত্যুর অন্যতম কারণ।
সন্তান হারানো পরিবারগুলোর দাবি, এ ঘটনার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

টিকা কার্যক্রমে জটিলতা ও সিদ্ধান্তহীনতা:
স্বাস্থ্য খাতে চতুর্থ ধাপের স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর প্রোগ্রাম (এইচএনপিএসপি) শেষ হয় ২০২৪ সালের জুনে। পঞ্চম ধাপের কার্যক্রমের প্রস্তুতি চললেও অন্তর্বর্তী সরকার সেটি বাতিল করে দুই বছরের একটি নতুন কর্মসূচি গ্রহণ করে। তবে টিকা ক্রয়ের বিকল্প ব্যবস্থা যথাসময়ে নিশ্চিত করা হয়নি।
এর ফলে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের পর টিকা কেনার অর্থ ছাড় বন্ধ হয়ে যায় এবং জটিলতায় পড়ে টিকা সংগ্রহ ও মজুত কার্যক্রম।
জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের দাবি, ক্রয় প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে সময়মতো গণটিকা সংগ্রহ সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে সরকারকে একাধিকবার সতর্কও করা হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, গণটিকা ক্যাম্পেইনের সিদ্ধান্ত ইন্টার-এজেন্সি কো-অর্ডিনেশন কমিটির মাধ্যমে নেওয়া হয়, যেখানে ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিরাও যুক্ত ছিলেন।
তদন্তের আশ্বাস:
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, টিকার সংকট ও হামে মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং দেশে ফিরে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানানো হবে। তার ভাষায়, বর্তমান সরকার স্বচ্ছতার সঙ্গে পুরো বিষয়টি পর্যালোচনা করছে।
বাড়ছে সংক্রমণ ও মৃত্যু:
অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্যেই দেশে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দুজন নিশ্চিত হামে আক্রান্ত ছিল, বাকিরা উপসর্গ নিয়ে মারা যায়। একই সময়ে ৫৪ জন নিশ্চিত এবং ১ হাজার ২৬১ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে।

১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে মোট ৬৮ হাজার ৮৬৯ শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে। মারা গেছে ৪৯৯ জন। এর মধ্যে ৮৫ জন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত ছিল এবং ৪১৪ জন উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। চলতি বছরে বিশ্বে হামে এটিই সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা। এ তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সুদান এবং তৃতীয় অবস্থানে পাকিস্তান।
বিভাগভিত্তিক পরিস্থিতি:
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে। সেখানে আক্রান্ত হয়েছে ২৯ হাজার ১৮৬ জন। এছাড়া চট্টগ্রামে ৯ হাজার ৮৫২, রাজশাহীতে ৫ হাজার ৮৯৬, বরিশালে ৫ হাজার ১৪২, সিলেটে ৩ হাজার ১১০, খুলনায় ৪ হাজার ৬০৭, ময়মনসিংহে ১ হাজার ৫৩৫ এবং রংপুরে ১ হাজার ২১২ জন আক্রান্ত হয়েছে।
মৃত্যুর সংখ্যাও সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে। সেখানে মারা গেছে ২১০ শিশু। এছাড়া রাজশাহীতে ৮১, চট্টগ্রামে ৫০, সিলেট ও বরিশালে ৪৮ জন করে, ময়মনসিংহে ৩৬, খুলনায় ২১ এবং রংপুরে ৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
গণটিকা কার্যক্রম কেন পিছিয়ে গেল:
সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় দেশে ৯ ও ১৫ মাস বয়সী শিশুদের হামের রুটিন টিকা দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রুটিন টিকাদানে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেনি। তবে রুটিন টিকায় বাদ পড়া শিশুদের আওতায় আনতে প্রতি চার বছর অন্তর দেশব্যাপী গণটিকা ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হয়।
২০২০ সালের পর ২০২৪ সালে নতুন গণটিকা ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, হাম-রুবেলার গণটিকা কার্যক্রমে অর্থ সহায়তা দিয়ে থাকে বৈশ্বিক টিকা জোট গ্যাভি। তাদের অর্থায়নে ইউনিসেফ টিকা সংগ্রহ ও ক্যাম্পেইন পরিচালনায় সহায়তা করে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সেক্টর প্রোগ্রাম বাতিল করে রাজস্ব বাজেট থেকে ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। এতে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয় এবং তিন দফায় পিছিয়ে যায় গণটিকা কার্যক্রম।
ফলে জানুয়ারিতে সংক্রমণ শুরু হয়ে মার্চে দেশব্যাপী ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মত:
জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সময়মতো গণটিকা আনা হয়নি, অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুত কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি এবং বর্তমান সরকারও জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ঘোষণা করেনি। এসব কারণ মিলেই পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে।
Leave a Reply