নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহী অঞ্চলের ব্যাংকিং খাতে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছেন বিতর্কিত ব্যাংক কর্মকর্তা ওয়াহিদা বেগম। রূপালী ব্যাংকের ১৯৯৮ ব্যাচের এই কর্মকর্তা ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই বিতর্ক আর প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পান। তার পেশাগত দক্ষতার ঘাটতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অস্থিরতা এবং অনিয়মের অভিযোগ তাকে একাধিকবার আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

ওয়াহিদা আক্তার স্বৈরাচার খুনি হাসিনার দোষড় এমন অভিযোগও ব্যাংকিং মহলে জোরেশোরে শোনা যাচ্ছে। রাজনৈতিক আনুগত্যকে পুঁজি করে তিনি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারের বিস্তার ঘটিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ওয়াহিদা বেগমের ব্যাংকিং জীবনের শুরুর দিকে, তিনি মাত্র ছয় মাসের জন্য বৈদেশিক বাণিজ্য শাখায় শাখা ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তার অদক্ষতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে তাকে ঐ পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। রূপালী ব্যাংকের সাবেক এক ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ওয়াহিদার কাজের গুণগত মান ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের, যার কারণে তাকে দীর্ঘমেয়াদে কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া সম্ভব হয়নি।
অবশ্য পরবর্তীতে অগ্রণী ব্যাংকে উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) পদে তার নিয়োগে চমক সৃষ্টি হয়। অনেকেই বিস্মিত হন তার আচরণ ও কর্তৃত্বপরায়ণ ভূমিকায়। মনে হচ্ছিল, যেন পুরনো পরিচয়ের বাইরে এক নতুন মানুষ সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। অথচ তার সার্ভিস রেকর্ড ছিল কার্যত শূন্য। পূর্বের কোনও উল্লেখযোগ্য সাফল্য না থাকা সত্ত্বেও, বিশেষ একটি মহলের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি এই উচ্চপদে পৌঁছে যান।
অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ওয়াহিদা বেগমের পেশাগত দক্ষতা নিয়ে বরাবরই প্রশ্ন ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব এবং লবিংয়ের মাধ্যমে তিনি একের পর এক পদোন্নতি লাভ করেন। সেই কর্মকর্তা আরও জানান, পদোন্নতি প্রক্রিয়াকে ঘিরে ওয়াহিদা বেগম সরাসরি আর্থিক লেনদেনে জড়িত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালে কর্মকর্তাদের পদোন্নতির একপর্বে তিনি প্রায় ৪০ জন কর্মকর্তার কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায় করেন। শুধু পদোন্নতিই নয়, বদলি নিয়েও কোটি টাকার বাণিজ্যে তিনি সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন বলেও নিশ্চিত করেছে একাধিক অভ্যন্তরীণ সূত্র।
এইসব অনিয়মের প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) ইতোমধ্যেই একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে। জানা যায়, কর্পোরেট গ্যারান্টি ছাড়া বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদন, অপরাধী গোষ্ঠীর অর্থায়ন এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থ পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িত একটি সিন্ডিকেটের নেতৃত্বও তিনি দিয়েছেন। ওই সিন্ডিকেটে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক এ কে এম ফজলুল হকসহ আরও কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তা যুক্ত ছিলেন।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ওয়াহিদা বেগমের বিরুদ্ধে আদালতের নির্দেশ অমান্য করার অভিযোগে তিনটি মামলায় মোট ৯ মাসের কারাদণ্ডও হয়েছে। যদিও আপিল বিভাগের চেম্বার কোর্ট থেকে সে রায় স্থগিত রয়েছে, তবে ফৌজদারি মামলাগুলো এখনো বিচারাধীন। এমন একজন বিতর্কিত ও অভিযুক্ত কর্মকর্তার আবারও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকের শীর্ষপদে ফিরে আসা দেশের আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন তোলে।
বিগত দিনগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে স্বৈরাচার হাসিনা তাঁর অনুগতদের প্রমোশন, পদোন্নতি ও নানা সুবিধা দিয়ে পুরস্কৃত করেছেন। তাদের মধ্যে এই ওয়াহিদা বেগম একইসাথে, প্রশাসন ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে নানা অনিয়ম, দুঃশাসন এবং দমন-পীড়নের পথকে প্রশ্রয় দিয়ে চলেছেন। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারে তিনি একটি ভয়ানক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, যেখানে মেধা ও যোগ্যতা নয়, বরং দলীয় আনুগত্যই হয়ে উঠেছে তার মূল মাপকাঠি
এতকিছুর পরেও ২০২৫ সালের ৯ মার্চ, ওয়াহিদা বেগম সেই পুরনো কায়দায় রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। ব্যাংকিং মহলের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, যোগদানের পরপরই তিনি পূর্বের সিন্ডিকেটকে পুনরায় সক্রিয় করার চেষ্টা করছেন। রাজনৈতিক সংযোগ কাজে লাগিয়ে, প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে রাজশাহীতে আবারও আধিপত্য বিস্তার শুরু করেছেন তিনি।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, অফিসার থেকে সিনিয়র অফিসার এবং সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার (এসপিও) পদে প্রমোশন দেওয়ার নামে ৪০ জন কর্মকর্তার কাছ থেকে লাখ নয়, কোটি টাকার ঘুষ নিয়েছেন ওয়াহিদা বেগম। শুধু তাই নয়, বদলির ক্ষেত্রেও কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়ম-দুর্নীতির নথি ইতোমধ্যেই দুদকে জমা পড়েছে।
রাজশাহীর বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন, ছাত্র সমাজ এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতারা তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। তাদের ভাষ্য, “যার নামে এত অনিয়ম আর দুর্নীতির অভিযোগ, তাকে ব্যাংকের মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে রাখা মানেই দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলা।” তারা অবিলম্বে ওয়াহিদা বেগমকে অপসারণ এবং তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়াহিদা বেগমকে তার ব্যবহৃত মুঠোফোন (01842-088899) একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে তার নম্বরে সাংবাদিক পরিচয়ে ক্ষুদে বার্তা পাঠালে ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) পরিচয়ে জিয়াউল হাসান ফোন করে তার পক্ষ থেকে বলেন, “সম্প্রতি ওয়াহিদা বেগমের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি বরাবরই সরকারি নীতিমালা মেনে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার পদোন্নতি ও নিয়োগ হয়েছে প্রক্রিয়াগতভাবে, কোনো প্রভাব বা আর্থিক লেনদেনের ভিত্তিতে নয়। একজন নারী কর্মকর্তা হিসেবে তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন, তবুও পেশাদারিত্ব বজায় রেখেছেন এবং ভবিষ্যতেও নীতিমালার আলোকে দায়িত্ব পালন করবেন।”

তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকার পরিবর্তনের পর যে স্বচ্ছতা ও দুর্নীতিমুক্ত ব্যাংক খাত গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাতে ওয়াহিদা বেগমের মতো বিতর্কিত ব্যক্তিদের পদচারণা সেই উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তারা মনে করছেন, এ ধরনের নিয়োগ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে এবং সাধারণ জনগণের আস্থা দুর্বল করে দেয়।
[সম্মানিত পাঠক, এই সংবাদের ২য় পর্ব খুব শীঘ্রই আসছে..]
জাভেদ/আরইসআর
Leave a Reply