গাইবান্ধা প্রতিনিধি: গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে ঝড়ে বিচ্ছিন্ন হওয়া বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপনের দাবি জানাতে গিয়ে পল্লী বিদ্যুতের সাব-স্টেশনে এক ছাত্রদল নেতাকে আটকে রেখে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনার পর উল্টো ওই ছাত্রদল নেতাকে প্রধান আসামি করে অজ্ঞাত ১০-১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ। ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

ঘটনাটি ঘটে গত বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাত সাড়ে ৮টার দিকে রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর সুন্দরগঞ্জ জোনাল অফিসের সাব-স্টেশনে। পরদিন শুক্রবার রাতে সুন্দরগঞ্জ থানায় ডিজিএম মিজানুর রহমান বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন।
মামলার আসামি ও মারধরের শিকার ছাত্রদল নেতার নাম আরমান মিয়া (২৬)। তিনি সুন্দরগঞ্জ ডি.ডব্লিউ সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি এবং পৌর এলাকার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সামিউল ইসলামের ছেলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক ঝড়-বৃষ্টিতে সুন্দরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুতের খুঁটি ও সংযোগ লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে আরমান মিয়াসহ বহু বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। টানা চারদিন বিদ্যুৎ না থাকায় তিনি একাধিকবার অভিযোগ দিয়েও সমাধান পাননি। পরে বাধ্য হয়ে বৃহস্পতিবার রাতে সাব-স্টেশনে যান।

অভিযোগ রয়েছে, সেখানে দায়িত্বরত এজিএম নন্দ কুমার দাসের সঙ্গে সংযোগ চালু করা নিয়ে বাকবিতণ্ডা হয়। আরমান মিয়ার দাবি, অফিস থেকে বের হয়ে বাড়ি ফেরার পথে সাব-স্টেশনের পাশের রাস্তা থেকে কয়েকজন কর্মচারী তাকে জোরপূর্বক তুলে ভেতরে নিয়ে যায়।
তার অভিযোগ, পরে একটি চালা ঘরে আটকে বিদ্যুতের তার, স্টিলের পাইপ ও বেল্ট দিয়ে তাকে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয়। এতে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম হয়। এছাড়া তার প্রায় ৩৫ হাজার টাকা মূল্যের মোবাইল ফোন ভাঙচুর করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
আরমানের স্বজনদের দাবি, খবর পেয়ে তারা সাব-স্টেশনে গিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। তাদের অভিযোগ, পুরো ঘটনাটি সাব-স্টেশনের সিসিটিভিতে ধারণ থাকার কথা।
এদিকে, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরমান মিয়া সুন্দরগঞ্জ থানায় পাল্টা লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে ডিজিএম মিজানুর রহমান, এজিএম নন্দ কিশোর দাস, গাড়িচালক লেবু মিয়া, লাইনম্যান মানিক মিয়া ও আশরাফুল আলমসহ ৫ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি অজ্ঞাত আরও ৫-৬ জনকে আসামি করা হয়েছে।

অভিযোগে আরমান মিয়া দাবি করেন, বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপনের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে এজিএমের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক হলেও কারও সঙ্গে তার কোনো মারামারি হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমি একাই অফিসে গিয়েছিলাম। কিন্তু সুযোগ নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আমাকে বেআইনিভাবে আটকে রেখে নির্যাতন করেছে। অথচ উল্টো আমার বিরুদ্ধেই হামলা ও মারধরের অভিযোগ এনে মামলা করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সেদিনের পুরো ঘটনা অফিসের সিসিটিভি ফুটেজে থাকার কথা। ফুটেজ প্রকাশ করা হলে প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট হয়ে যাবে। বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মারধরে আমি গুরুতর আহত হয়েছি। এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছি।’
ভুক্তভোগীর পরিবারের অভিযোগ, আরমানকে বেদম মারধর করে নিজেদের দায় আড়াল করতেই পাল্টা মামলা দায়ের করেছে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ। অথচ তাদের দেওয়া অভিযোগ ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও মামলা হিসেবে রেকর্ড হয়নি। তারা দ্রুত মামলা গ্রহণ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

অন্যদিকে রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১, সুন্দরগঞ্জ জোনাল অফিসের দাবি, আরমান মিয়ার নেতৃত্বে কয়েকজন ব্যক্তি সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ করে অফিসে উত্তেজনা সৃষ্টি করেন এবং কর্মচারীদের সঙ্গে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন।
এ বিষয়ে ডিজিএম মিজানুর রহমান বলেন, ‘ঝড়ে অন্তত ২০টি খুঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছিল। আমরা সংযোগ স্বাভাবিক করতে কাজ করছি। এ অবস্থায় আরমান মিয়া কয়েকজনকে নিয়ে অফিসে এসে উত্তেজিত আচরণ করেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আরমানকে মারধরের অভিযোগ সঠিক নয়। বরং অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরামর্শেই মামলা করা হয়েছে।’
সিসিটিভি ফুটেজ প্রসঙ্গে ডিজিএম দাবি করেন, সাব-স্টেশনে মাত্র একটি আউটডোর ক্যামেরা রয়েছে এবং সেটিতে সর্বশেষ গত ২৫ মার্চ ফুটেজ রেকর্ড হয়েছে। প্রযুক্তিগত ত্রুটি ও মেমোরি সমস্যার কারণে এরপর আর কোনো ফুটেজ সংরক্ষিত হয়নি। এছাড়া সাব-স্টেশনের আশপাশে অন্য কোনো সিসিটিভি ক্যামেরাও নেই বলে জানান তিনি।

বিষয়টি নিশ্চিত করে সুন্দরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহিন মোহাম্মদ আমানুল্লাহ জানান, বিদ্যুৎ অফিসে হাতাহাতির ঘটনায় আরমান মিয়াকে প্রধান আসামি করে অজ্ঞাত ১০-১৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। পাশাপাশি আরমান মিয়াও ডিজিএম ও এজিএমের বিরুদ্ধে পাল্টা লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
ওসি বলেন, ‘সরকারি বা আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ও তদন্ত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। বিষয়টি আইনগত প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়া উভয় পক্ষের মধ্যে আপোষ-মীমাংসার চেষ্টাও চলছে।’
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, সাব স্টেশনে দীর্ঘ প্রায় দুই মাস ধরে সিসিটিভি ক্যামেরা অচল থাকলেও কেন তা মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অথচ সাব-স্টেশন থেকে মাত্র ৩০০ গজ দূরে ডিজিএম অফিসের ভেতর-বাইরে একাধিক সচল সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে।

অপরদিকে, এ ঘটনায় ছাত্রদলের নেতাকর্মীসহ স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ সেবা নিশ্চিত করার পরিবর্তে গ্রাহককে আটক রেখে মারধর ও নির্যাতনের মতো ঘটনা ঘটানো হয়েছে, যা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক।
তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আরমান মিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা।
দাবি আদায় না হলে প্রতিবাদ মিছিল, মানববন্ধনসহ কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ারিও দেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা।
Leave a Reply