আমিনুল ইসলাম,স্টাফ রিপোর্টার: বৈরী প্রকৃতির ভয়াবহ থাবায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বৃহত্তর হাওড়পারে কৃষকদের কান্নার রোল পড়েছে। বন্যা ও জলাবদ্ধতার কবল থেকে উদ্ধার বোরো ফসলের অংশবিশেষ রোদে শুকিয়ে ঘরে তোলার আগেই আবার অতি বৃষ্টির কবলে পড়ে। এতে স্বপ্নের বোরো ধান নষ্ট হওয়ার পথে। ধানের রং নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ ধান কিনতে অনীহা প্রকাশ করেছে সরকারি খাদ্য গুদাম। এ কারণে এক শ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়া ও পাইকারদের কাছে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা মন ধান বিক্রি করতে তারা বাধ্য হচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে মহাজনি ঋণের চাপ এবং পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে কৃষকরা এখন দিশেহারা। ধানের ন্যায্য দাম না পেয়ে তাদের কাছে ঈদুল আজহার উৎসব ফিকে হয়ে আসছে।

বৈরী প্রকৃতিতে কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সিলেট জেলার ৩৯টি উপজেলার হাওড় জনপদ স্বপ্নের বোরো ফসলের ম-ম গন্ধে বিমোহিত হচ্ছিল। ১ বৈশাখ থেকে বৃহত্তর হাওড়াঞ্চলে বোরো ফসল ঘরে তোলার ধুমও পড়ে। জমি থেকে ফসল কেটে খলায় খলায় অথবা উন্মুক্ত মাঠে ধান রোদে শুকানো ও ঘরে তোলার কাজ শুরু হয়। কাকডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছিলেন কিষান-কিষানিরা। কিন্তু ফসল কেটে ঘরে তোলার সময়ই উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢল ও অতি বৃষ্টিতে উৎসব আয়োজনে বিষাদের ছায়া নেমে আসে। একের পর এক পানির নিচে তলিয়ে যেতে থাকে ফসলের জমি এবং ধান শুকানোর মাঠ-খলা। পানিতে ভাসতে থাকে কৃষকের স্বপ্ন।
প্রাণপণ সংগ্রাম করেও শেষ রক্ষা হয়নি। পানিতে ডুবে-পচে ও রং নষ্ট হয়ে যাওয়া ধান নিয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয় হাওড়াঞ্চলের বোরো চাষিরা। তাদের ঘরে ঘরে ঈদ উৎসবের পরিবর্তে কান্না আশ্রয় নিয়েছে। ১৫ মে পর্যন্ত কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী-৩৯টি উপজেলায় প্রায় এক হাজার ১১০ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এতে প্রায় আড়াই লাখ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সরকারি হিসাবে প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে, যা হাওড়ের মোট জমির প্রায় ১১ শতাংশ। চালের হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দুই লাখ ১৪ হাজার টন।

সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার সদর ইউনিয়নের দীঘিরপাড় গ্রামের কৃষক দাউদ সালেক মিয়া বলেন, এবার ৮ একর জমিতে বোরো ফসল চাষ করেছি। এর মধ্যে মাত্র ৩ থেকে সাড় ৩ একর জমির ফসল কেটে ঘরে তুলতে পেরেছি। বাকি সাড়ে ৪ একর জমির ফসল অথৈ পানিতে তলিয়ে গেছে। প্রায় সাড়ে ৪০০ মন ধান নষ্ট হওয়ায় তার পরিবারে চলছে আহাজারি-হাহাকার। তিনি বলেন, বোরো ফসল করেই তিনি জীবিকা নির্বাহ করেন। এবার মহাজনি ঋণ ও ব্যাংক ঋণ শোধের কোনো সুযোগই থাকল না।
কিশোরগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোশাররফ হোসেন বলেন, ৩ মে থেকে সরকারি খাদ্য গুদামগুলোতে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে। এ অভিযান আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চলবে। তবে কৃষকদের কাছ থেকে কোনো রং নষ্ট ও ভেজা ধান নেওয়া হচ্ছে না।
Leave a Reply