অনলাইন ডেস্ক: বাংলাদেশ ১৯৮৯ সাল থেকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে আসছে। এই সময়ে একটি অন্যতম বৃহৎ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে পরিচিতি লাভ করেছে বাংলাদেশ। এই অংশগ্রহণ শুধু আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ও মানবিক সহমর্মিতার প্রতিফলন নয়, বরং শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত সদস্যরা যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেন, তা বাংলাদেশের রেমিট্যান্সপ্রবাহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

এছাড়া আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষায় সক্রিয় অংশগ্রহণ বাংলাদেশকে একটি শান্তিপ্রিয়, মানবিক ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান সুদৃঢ় হয়েছে।
এবার জাতিসংঘ ও বাংলাদেশ পুলিশ সূত্র জানায়, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনগুলোতে চলমান অর্থ সংকটের কারণেই এই সদস্যসংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নিতে চলতি বছরের ২৭ মে কঙ্গোর রাজধানী কিনশাসার উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়ে বাংলাদেশ পুলিশের ১৮০ সদস্যের একটি দল।

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের একমাত্র অবশিষ্ট কনটিনজেন্টকে কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্তে বৈশ্বিক শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের পুলিশের দীর্ঘদিনের ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
১৮০ সদস্যের এই কনটিনজেন্টের মধ্যে ৭০ জন নারী পুলিশ কর্মকর্তা রয়েছেন। তারা আগামী নভেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরে আসবেন। মাত্র দুই মাস আগে এই কনটিনজেন্টের অংশ হিসেবে জাতিসংঘের একমাত্র সর্ব-মহিলা পুলিশ ইউনিট মোতায়েন করা হয়েছিল।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর কাছে আসা জাতিসংঘের নথিতে কঙ্গো, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র এবং দক্ষিণ সুদানের বিভিন্ন মিশনে ধাপে ধাপে সদস্যসংখ্যা কমানো ও প্রত্যাবাসনের পরিকল্পনা উল্লেখ করা রয়েছে।

ওই নথি অনুযায়ী, বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যাদের পুরো কনটিনজেন্ট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অপরদিকে ক্যামেরুন, সেনেগাল ও মিশরের মতো দেশের কনটিনজেন্ট আংশিকভাবে হ্রাস করা হবে।
জাতিসংঘ ও বাংলাদেশ পুলিশ সূত্র জানায়, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনগুলোতে চলমান অর্থ সংকটের কারণেই এই সদস্যসংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের একজন অতিরিক্ত ডিআইজি নিশ্চিত করেছেন, জাতিসংঘের বাজেট সংকোচন ও সংস্থার জনবল কমানোর নীতির কারণে বাংলাদেশের এফপিইউ ইউনিটকে নভেম্বরের মাঝামাঝি দেশে ফিরে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, “কঙ্গোতে জাতিসংঘ মিশনের পুলিশ কমিশনার আমাদের ইউনিট কমান্ডারকে মৌখিকভাবে বিষয়টি জানিয়েছেন। এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি পাইনি। বাংলাদেশের এফপিইউ সব সময় ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করেছে, তাই এই সিদ্ধান্তটি বেশ হতাশাজনক।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী পুলিশ সুপার (মিডিয়া) শাহাদত হোসেন বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে পাঁচ বছর আগে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করা পুলিশের এক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের কূটনৈতিক দুর্বলতাকেই প্রকাশ করছে।

তিনি বলেন, “জাতিসংঘ সাধারণত সদস্যসংখ্যা কমালে তা সব দেশের ক্ষেত্রেই আংশিকভাবে প্রযোজ্য হয়। কিন্তু এবার পুরো বাংলাদেশ এফপিইউকে নভেম্বরের মধ্যে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এটি পুলিশের জন্য যেমন হতাশার, তেমনি জাতির জন্যও। সরকারের উচিত ছিল জাতিসংঘের সঙ্গে আলোচনায় যাওয়া।”
সূত্র জানায়, ২০ অক্টোবরের মধ্যে ১৬২ জন সদস্যকে প্রত্যাবাসন করা হবে, আর বাকি ১৮ জন প্রশাসনিক ও লজিস্টিক কার্যক্রম সম্পন্ন করে নভেম্বরের মধ্যভাগে ফিরবেন।
বর্তমান এই দলটি আগস্টে কঙ্গো পৌঁছে ১০ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যক্রম শুরু করে। মাত্র এক মাস পরই জাতিসংঘ তাদের ফেরার নির্দেশ দিয়েছে।
২০০৫ সাল থেকে কঙ্গোতে বাংলাদেশ পুলিশের নারী এফপিইউ ইউনিট দায়িত্ব পালন করছে। চলতি বছরের আগস্টে ওই নারী ইউনিটের মেডেল প্যারেডে জাতিসংঘ মহাসচিবের কঙ্গো বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
সূত্র জানায়, এটি ছিল জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বিরল এক স্বীকৃতি, যা ইউনিটটির প্রতি তাদের আস্থা প্রকাশ করে।
অন্তত ১০ জন কর্মকর্তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানিয়েছেন, এ সিদ্ধান্ত জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অবদানের জন্য বড় ধাক্কা। এক কর্মকর্তা বলেন, “তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে এই ইউনিট দেশের জন্য সম্মান ও গৌরব বয়ে এনেছে। সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে যদি এটি বন্ধ হয়ে যায়, তা হবে গুরুতর আঘাত।”

এক নারী সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, “সরকারের সক্রিয় উদ্যোগের অভাবে আমাদের পুলিশ এখন পুরোপুরি কোণঠাসা অবস্থায়, জাতিসংঘের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারছে না। অথচ নারী এফপিইউর ভূমিকা কেবল পুলিশের অর্জন নয়—এটি জাতীয় গৌরব, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরে। এটি ঠিক করতে হলে সরকারকে এখনই দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে।”
১৯৮৯ সাল থেকে বাংলাদেশ পুলিশ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। পুলিশের প্রথম মিশন ছিল নামিবিয়ায়।
২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের ২১ হাজারেরও বেশি কর্মকর্তা বিশ্বজুড়ে ২৪টি দেশে ২৬টি মিশনে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, দক্ষিণ সুদান ও মধ্য আফ্রিকা।
Leave a Reply