বিজ্ঞাপন:
 
সংবাদ শিরোনাম:
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় বিএনপি জামায়াত সংঘর্ষ -আহত ১৫ পঞ্চগড়ে সীমান্তে পৃথক দুটি অভিযানে ১জন চোরাকারবারি সহ ভারতীয় গরু আটক বসুন্ধরা শুভসংঘের লালমনিরহাট জেলা সহসভাপতি হলেন শিক্ষানুরাগী রাশেদ ব্যারিস্টার ফুয়াদের নির্বাচনী প্রচারণায় যুবদলের বাধা, জামায়াতের বিক্ষোভ চট্টগ্রামে তারেক রহমান; কাল চার জেলায় ৬ জনসভা আ. লীগের নিরপরাধ কর্মীরা ১০ দলীয় জোটে আসতে পারবেন: হান্নান মাসউদ লালমনিরহাট‎ ‎-৩ আসনের দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীর সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় জামায়াত কখনো সরকারে গিয়ে কাজ করেনি, বিএনপি পরীক্ষিত দল: মির্জা ফখরুল ক্ষমতায় আসলে দিনাজপুরকে সিটি করপোরেশন করা হবে: জামায়াত আমির জামায়াতের অপপ্রচারের প্রতিবাদে দক্ষিণ আইচা থানা বিএনপির সংবাদ সম্মেলন

চার চিকিৎসকের কাঁধে আট লাখ মানুষের ভার

রাশেদুল ইসলাম রাশেদ,গাইবান্ধা: গাইবান্ধার উত্তর প্রান্তে তিস্তা নদীবিধৌত জনপদ সুন্দরগঞ্জ। ১৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এই উপজেলায় প্রায় সাড়ে আট লাখ মানুষের বসবাস। অথচ আধুনিক চিকিৎসাসেবার আশায় এই বিপুল জনগোষ্ঠীর আশ্রয়স্থল সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত রয়েছেন মাত্র চারজন চিকিৎসক। প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক নেই, নেই সেবিকাও। তীব্র জনবল সংকটের মুখে অপারেশন থিয়েটার কার্যত অচল। ব্যাহত হচ্ছে জরুরি বিভাগের সেবাও। চিকিৎসা নিতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর অনেকেই ফিরে যাচ্ছেন হতাশ হয়ে।

মাত্র চারজন চিকিৎসক নিয়ে এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স যেন এখন নিজেই জরুরি শুশ্রষার অপেক্ষায় বসে আছে। চিকিৎসক ও জনবল সংকটে ন্যুব্জ হয়ে পড়া হাসপাতালটি কার্যত চিকিৎসাহীন। প্রতিটি ওয়ার্ড, করিডোর আর বহির্বিভাগে রোগীর উপচেপড়া ভিড়। কিন্তু সেখানে নেই পর্যাপ্ত সেবা। অসহায় মুখগুলো যেন প্রতিধ্বনিত করছে একই প্রশ্ন, ডাক্তার কই? ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ শতাধিক রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। অথচ ৩১৬টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ১১৭টি পদই শূন্য। এখানে ফার্মাসিস্ট নেই, এমনকি নেই অ্যাম্বুলেন্স চালানোর মতো ড্রাইভারও। রোগী আসছে প্রতিদিন, কিন্তু সেবা কোথায়?

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ৯টি মেডিকেল অফিসারের মধ্যে ৫টি পদ শূন্য। আবাসিক মেডিকেল অফিসারের চেয়ার বহুদিন ধরেই খালি। হোমিও চিকিৎসক প্রেষণে রয়েছেন। ১১টি জুনিয়র কনসালটেন্ট পদের ৯টি, ১৩টি সহকারী সার্জনের ১০টি এবং ১৭টি উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারের সব পদ শূন্য। যা নিঃসন্দেহে ভয়াবহ সংকট।

এ ছাড়া পরিসংখ্যানবিদ, হেলথ এডুকেটর, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব ও ফিজিও), কার্ডিওগ্রাফার, বাবুর্চি সবাই যেন ‘নেই’-এর তালিকায়। ৮৫ জন স্বাস্থ্য সহকারীর মধ্যে ৩১টি পদই ফাঁকা। শুধু চিকিৎসক নয়, সহায়ক ব্যবস্থাপনাও মারাত্মক দুর্বল হয়ে পড়েছে।

হাসপাতাল ঘুরে সরেজমিন দেখা যায়, বহির্বিভাগে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন শত শত রোগী। অনেকেই সকাল ৮টায় এসে দুপুর গড়িয়ে গেলেও ডাক্তার দেখাতে পারেননি। কারও মুখে বিরক্তি, কারও চোখে ক্লান্তি। হাসপাতালের করিডোরজুড়ে অসুস্থ মানুষ আর তাদের স্বজনদের উৎকণ্ঠা যেন জমাট বাঁধা হতাশায় রূপ নিয়েছে।

জরুরি বিভাগে একটি চেয়ারে হেলান দিয়ে ছটফট করছিলেন এক বৃদ্ধা রোগী। তার মেয়ে আয়েশা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, সকাল থেকে মাকে নিয়ে বসে আছি, ডাক্তার একবারও এসে দেখেননি। কাকে বলব? সবাই বলে ডাক্তার নাই, অপেক্ষা করেন। কিন্তু একজন বৃদ্ধা মানুষ কতক্ষণ এমন কষ্ট নিয়ে বসে থাকবে?

এক বৃদ্ধ রোগীর ছেলে আরিফুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ভেবেছিলাম সরকারি হাসপাতালে অন্তত জরুরি বিভাগে একটু সাড়া পাওয়া যাবে। সরকারি হাসপাতাল হলেও কোনো দায়িত্ববোধ নেই কারও মধ্যে। এমন চিত্র শুধু একজন বা দুজন রোগীর নয়, সেখানে অপেক্ষমাণ শত শত রোগীর মুখে মুখে ঘুরছে একই অভিযোগ, একই আক্ষেপ-ডাক্তার কই?

এক প্রসূতি নারীর স্বামী আবদুল আজিজ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গাইনি ডাক্তার নেই, বলছে ডেলিভারি সম্ভব না, বড় হাসপাতালে যেতে হবে। তা হলে এখানে হাসপাতাল রেখে কী লাভ? অপারেশন থিয়েটার কার্যত বন্ধ। নেই পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, নেই সার্জন। ছোটখাটো অস্ত্রোপচারও বন্ধ হয়ে গেছে বহুদিন ধরে। ইনডোরে রোগী ভর্তি থাকলেও অনেক সময় চিকিৎসা পাচ্ছেন না নিয়মমাফিক।

হরিপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আবদুল লতিফ বলেন, এই হাসপাতাল থেকে একসময় আমার বাবা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন, আজ আমার সন্তানের চিকিৎসা হচ্ছে না ডাক্তার না থাকার কারণে।

উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক বাবুল আহমেদ বলেন, প্রায় সাড়ে আট লাখ মানুষের চিকিৎসা দিতে মাত্র চারজন চিকিৎসক, এটা অমানবিক। তারা অনেক পরিশ্রম করেও রোগীদের যথাযথ সেবা দিতে পারছেন না। দ্রæত চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগ জরুরি।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. দিবাকর বসাক বলেন, এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ রোগী বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন। অথচ কাগজে-কলমে ২৩টি মেডিকেল অফিসার পদের মধ্যে মাত্র ৭ জন কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে দুজন প্রেষণে, একজন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে। বাস্তবে মাত্র চারজন চিকিৎসক দিয়ে এত বিপুল সংখ্যক রোগীর সেবা দেওয়া কার্যত অসম্ভব।

তিনি আরও বলেন, শূন্যপদের বিস্তারিত তালিকা ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য অধিদফতরে পাঠানো হয়েছে। আমরা আশা করছি দ্রæত পদগুলো পূরণ হলে চিকিৎসাসেবার মান অনেকটাই উন্নত হবে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ওয়েবসাইট এর কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি।
Design & Development BY : ThemeNeed.com