গাইবান্ধা প্রতিনিধি: গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে বিসিআইসি অনুমোদিত সার ডিলারদের বিক্রয়কেন্দ্র ও গুদাম পরিদর্শন করেছেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। পরিদর্শনকালে ডিলারদের মাসিক বরাদ্দ, গুদামের মজুদ, বিক্রয় রেজিস্টার ও কৃষকদের কাছে সার বিতরণের তালিকা যাচাই করা হয়। একই সঙ্গে সার নিতে আসা কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রি, সরবরাহ পরিস্থিতি এবং কোনো ধরনের হয়রানি বা অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হয়।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) দুপুরে উপজেলার জামালপুর, ফরিদপুর ও রসুলপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন ডিলার পয়েন্টে এ পরিদর্শন করেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) কৃষিবিদ মো. আসাদুজ্জামান। এ সময় অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শষ্য) সুর্দশন শিকদার, সাদুল্লাপুর উপজেলার অতিরিক্ত কৃষি অফিসার সাজ্জাদ হোসেন, কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার মো. এনামুল কবির তুহিন, উদ্ভিদ সংরক্ষণ অফিসার আব্দুর রব সরকারসহ সংশ্লিষ্ট ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পরিদর্শনের শুরুতে জামালপুর ইউনিয়নের জামালপুর বাজারে মেসার্স কুমুদিনী ট্রেডার্সের ডিলার পয়েন্ট পরিদর্শন করেন উপপরিচালক মো. আসাদুজ্জামান। এ সময় তিনি গুদামে থাকা সারের মজুদ ও বিক্রয় রেজিস্টার যাচাই করেন। পাশাপাশি সার নিতে আসা কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তারা নির্ধারিত মূল্যে সার পাচ্ছেন কি না, কোনো ডিলার বেশি দাম নিচ্ছেন কি না এবং সার সংগ্রহে কোনো বাধা বা হয়রানির শিকার হচ্ছেন কি না, তা জানতে চান।

উপস্থিত কৃষকরা জানান, বর্তমানে ডিলারের কাছে নির্ধারিত দামেই সার পাওয়া যাচ্ছে। তবে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় কখনো কখনো নতুন করে সার আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। জামালপুর বাজারের বাসিন্দা আবুল কালাম জানান, এক বস্তা সার নিতে এসে খুচরা হিসাবে ২৫ কেজি সার পেয়েছি। ২৭ টাকা কেজি দরে মোট ৬৭৫ টাকা নিয়েছে ডিলার।
হামিন্দপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল জোব্বার বলেন, ডিলারের কাছ থেকে নির্ধারিত দামেই সার পাওয়া যাচ্ছে। দুপুরে গুদামে এসে এক বস্তার সার নেই ১৩৫০ টাকা দিয়ে। তবে ইউনিয়নে মাত্র একজন ডিলার থাকায় চাহিদার সময় চাপ বেড়ে যায়। এ সমস্যা কমাতে আরও ডিলার পয়েন্ট চালু এবং বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।
এ সময় কৃষকদের উদ্দেশে কৃষিবিদ মো. আসাদুজ্জামান বলেন, জেলায় সারের কোনো সংকট নেই। সার সংকটের গুজবে কান না দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী অনুমোদিত ডিলারদের কাছ থেকে সার সংগ্রহ করতে হবে। তিনি বলেন, সরকার নির্ধারিত মূল্যের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, সার মজুদ করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি কিংবা কৃষকদের হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, আগামী মাসে ডিলারদের মাসিক বরাদ্দ বাড়ানোর বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হবে। কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী, অবৈধ মজুদদার কিংবা অতিরিক্ত অর্থ আদায়কারীদের বিরুদ্ধে মাঠ পর্যায়ে তদারকি, গুদাম পরিদর্শন ও বাজার মনিটরিং অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নিয়মিত নজরদারি করা হচ্ছে।

এ সময় সংশ্লিষ্ট ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোস্তাফিজার রহমান, সংশ্লিষ্ট পয়েন্টের ডিলার, স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য আবুল কালাম ও রেজাউল ইসলামসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
বর্তমান সারের চাহিদা ও বরাদ্দের বিষয়ে জামালপুর ইউনিয়নের ডিলার এসকে রঞ্জন দোলন জানান, অন্যান্য ইউনিয়নে দুইজস ডিলার থাকলেও জামালপুর ইউনিয়নে মাত্র একজন ডিলার রয়েছে। বোরো ও আমন মৌসুমে এ ইউনিয়নে সারের চাহিদা বেশি থাকায় বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন।
তিনি জানান, চলতি মাসে ৬৫ মেট্রিক টন সার উত্তোলন পূর্বক বিতরণ করায় বর্তমানে সারের মজুদ নাই। তবে চাহিদা মেটাতে দুই দফায় অতিরিক্ত আরও ৭ মেট্রিক টন সার সংগ্রহ করে কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। আর সেপ্টেম্বর মাসের আগাম বরাদ্দের ৬০ মেট্রিক টন সার বাফার গোডাউন থেকে দ্রুত উত্তোলন করা হবে।
তিনি আরও জানান, প্রতিমাসের বরাদ্দ অনুযায়ী গুদাম থেকে উত্তোলন করা সার পর্যায়ক্রমে কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। কৃষকরা সার পাচ্ছেন কি না, তা মনিটরিংসহ মজুদ, বরাদ্দ ও বিক্রির তথ্য প্রতিদিন রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করাসহ যাচাই করেন সংশ্লিষ্ট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা।

ডিলার পয়েন্টটি সিসি ক্যামেরার আওতায় রয়েছে। কত বস্তা সার গুদামে প্রবেশ করছে, কোন কৃষক কখন কত বস্তা সার নিচ্ছেন—তার হিসাব সংরক্ষণ করা হচ্ছে। কৃষকের নামের তালিকাসহ প্রতিদিনের বিক্রয় প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠাতে হয়। ফলে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, হয়রানী কিংবা সার মজুদ করে রাখার সুযোগ নেই বলে জানান তিনি।
ফরিদপুর ইউনিয়নের ভাজাকালাই বাজারের খালেদা ট্রেডার্সের ম্যানেজার কান্তিরাম বর্মন বলেন, ডিলার হিসেবে যে বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে, তা নিয়ম মেনে কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। সারের কোন সংকট নেই। তবে অনেক সময় এক বস্তা প্রয়োজন এমন কৃষকরাও তিন-চার বস্তা সার কিনে মজুদ করছেন। আবার স্থানীয় কিছু ছোট ব্যবসায়ী কৃষকদের মাধ্যমে সার কিনে দোকানে বিক্রি করছেন। এতে বাজারে কৃত্রিম চাপ তৈরি হতে পারে।
তিনি জানান, আগের মৌসুমগুলোতে কৃষকদের চাহিদা মেটানোর পরও ডিলারদের কাছে শত শত বস্তা সার মজুদ থাকত। কিন্তু তত্বাবধায়ক সরকার আমলে বরাদ্দ কমিয়ে দেয়া হয়। যা বর্তমানেও চলমান থাকায় মজুদের কোন সুযোগ নেই। প্রতি বোরো ও আমন মৌসুমে সারের চাহিদা বাড়ায় ডিলারদের মাসিক বরাদ্দের পরিমাণ আরও বাড়ানো উচিত বলে মত দেন তিনি।
অপরদিকে, রসুলপুর ইউনিয়নের মিরপুর বাজারের একেএম মফিজুল ইসলাম ডিলার পয়েন্টের ম্যানেজার আব্দুল হামিদ জানান, সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রি করা হচ্ছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সার বিতরণ করা হলেও একই সময়ে বেশি কৃষক উপস্থিত হলে কিছুটা অপেক্ষা করতে হয়। এছাড়া সার নিতে এসে কৃষকদের কোন ধরণের ভোগান্তি ও হয়রানীর ঘটনা নেই৷

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, সাদুল্লাপুর উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোতে ১৮টি বিসিআইসি ডিলার পয়েন্ট রয়েছে। সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এসব কেন্দ্র থেকে কৃষকরা সার সংগ্রহ করছেন। সরকার নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী ইউরিয়া সার প্রতি কেজি ২৭ টাকা এবং ৫০ কেজির বস্তা ১ হাজার ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সারের সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পর্কে সাদুল্লাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অপূর্ব ভট্টাচার্য জানান, দেশের কোথাও কোথাও ইউরিয়া সারের বাড়তি দামের অভিযোগ থাকলেও সাদুল্লাপুরে পরিস্থিতি ভিন্ন। এখানকার কৃষকদের নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে না।
তিনি বলেন, কোনো ডিলারের কাছে সার নিতে এসে কৃষক ফিরে গেছেন—এমন ঘটনা নেই। কোথাও এক টাকাও বেশি নেওয়া হচ্ছে না। মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত তদারকি ও মনিটরিং করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা ডিলার পয়েন্ট ও মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি আরও জানান, সার নিতে গিয়ে লাইনে দাঁড়ানো বা অপেক্ষার কারণে কোথাও কোথাও কৃষকদের কিছুটা ভোগান্তি হচ্ছে। তবে চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ করা হচ্ছে। কোনো ডিলার পয়েন্টে চাহিদা বেশি হলে অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনে পার্শ্ববর্তী ডিলার পয়েন্ট থেকে সার সমন্বয় করে সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে বর্তমানে ইউরিয়া সারের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের কারণ নেই।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, কৃষকদের কাছে সার বিক্রিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ডিলার পয়েন্টগুলো নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অবৈধ মজুদ ও অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের সহযোগিতায় অভিযান অব্যাহত থাকবে।
সম্প্রতি সাদুল্লাপুর উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের উত্তর মন্দুয়ার গ্রামের একটি বাড়ি থেকে অবৈধভাবে মজুদ রাখা ইউরিয়া ও নন ইউরিয়া প্রায় অর্ধশতাধিক বস্তা উদ্ধার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অবৈধ মজুদ, কালোবাজারি বা সার নিয়ে কোনো সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন কৃষি কর্মকর্তারা।
Leave a Reply