জিল্লুর রহমান মণ্ডল (পলাশ): বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় ভূমি সংক্রান্ত দেওয়ানি মামলা মানেই এক সীমাহীন দীর্ঘসূত্রতা, মানসিক ভোগান্তি ও সর্বশান্ত হওয়ার পথ। স্বত্ব ঘোষণা, নিষেধাজ্ঞা কিংবা বাটোয়ারা মামলার নামে দেওয়ানি আদালতগুলোতে গড়ে উঠেছে এক অদৃশ্য জাঁতাকল। নোটিশ-সমন জারি, আরজি দাখিল, লিখিত জবাব পেশ ও সাক্ষ্য গ্রহণের চক্করে কেটে যায় যুগের পর যুগ।

গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর সহকারী জজ আদালতের চিত্রটিও তেমনই সংকটাকীর্ণ। এই একটি আদালতেই প্রায় ৪ হাজার মামলা পেন্ডিং, যার সিংহভাগই দেওয়ানি ও পারিবারিক ভূমি বিরোধ সংক্রান্ত। দীর্ঘদিন বিচারক শূন্য থাকা কিংবা অতিরিক্ত দায়িত্বে চলা বিচারিক কার্যক্রমে প্রতিদিন ৩৫-৪০টি মামলা শুনানির তালিকায় থাকলেও বাস্তবে কেবল হাজিরা আর পরবর্তী তারিখেই সীমাবদ্ধ থাকে দিনপঞ্জি। এর ফলে বাদী-বিবাদীর জীবন শেষ হয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মামলার জাঁতাকল বয়ে বেড়াতে হয়; পকেট থেকে প্রতিনিয়ত চলে যায় হাজার হাজার টাকা।
আইনের এই দীর্ঘসূত্রতা ও কাঠামোগত দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে একশ্রেণীর অসৎ ও প্রভাবশালী চক্র তৈরি করে জালিয়াতির জটিল ফাঁদ। ২০০৪ সাল থেকে টানা ২২ বছর ধরে চলমান একটি বাটোয়ারা ও স্বত্ব ঘোষণার মামলা (মামলা নং—৫২/২০০৪ ও অন্যান্য ৭৬/২০০৬) দেওয়ানি বিচার ব্যবস্থার এই চরম ভোগান্তির এক জীবন্ত দলিল।
একজন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য, পেশাদার গণমাধ্যমকর্মী এবং শিক্ষানবিশ আইনজীবী হিসেবে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান, শতবর্ষের দলিল, খাজনা দাখিলা, বিআরএস খতিয়ান ও আদালতের নথিপত্র বিশ্লেষণ করে বিবাদীপক্ষের ৫ শতক জমি গ্রাসের নেপথ্য জালিয়াতির সত্য তুলে ধরছি।

নালিশী সম্পত্তির পরিচয় ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
আদালত: বিজ্ঞ সিনিয়র সহকারী জজ আদালত, সাদুল্লাপুর, গাইবান্ধা। মামলা সংক্রান্ত তথ্য: বাটোয়ারা মামলা নং—৫২/২০০৪ (বাদী: জোবেদা বেওয়া গং) এবং স্বত্ব ঘোষণা মামলা নং—৭৬/২০০৬ (বাদী: এ্যাডভোকেট মো. জহুরুল ইসলাম মণ্ডল বনাম বিবাদী আব্দুল করিম গং)।
নালিশী জমি: জেলা—গাইবান্ধা, মৌজা—সাদুল্লাপুর (জে.এল নং ৪১), সি.এস খতিয়ান নং ৩০৩, দাগ নং ৫২৬, মোট জমি ২৪ শতক। পূর্ব ইতিহাস: সি.এস আমলে উক্ত এলাকার মূল জোত জমিদার ছিলেন মহারাজা স্যার প্রদ্যোৎকুমার ঠাকুর বাহাদুর (কে.টি. এস্টেট) ও তাঁর পক্ষে কোর্ট অফ ওয়ার্ডসের শৈলেশচন্দ্র রায়। পরবর্তীতে উক্ত জমির একচ্ছত্র প্রজা ও দখলকার ছিলেন জমিদার মৃগেন্দ্রনাথ চাকী।
আইনি বিশ্লেষণ, বাদীর সাজানো ফাঁদ ও গাণিতিক জালিয়াতির আদ্যোপান্ত
১. শতবর্ষব্যাপী ভৌত ভোগদখল ও বৈধ পত্তন (১৯৩৬–বর্তমান) : বিবাদীপক্ষের পূর্বপুরুষ ময়েজ উদ্দিন মণ্ডল, সমশের উদ্দিন মণ্ডল ও আব্দুল কাদের মণ্ডল ১৯৩০ সালের পর থেকে জমিদারকে খাজনা প্রদান শর্তে নালিশী ৫২৬ দাগের উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে সীমানা নির্ধারণ করে ভোগদখল শুরু করেন।
রেজিস্ট্রি কবুলিয়ত (১৯৩৬): ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৬ তারিখের ৫২৮ নম্বর রেজিস্ট্রিকৃত কবুলিয়ত দলিলের মাধ্যমে ২ কাটা (৩ শতক) জমি পত্তন নেওয়া হয় এবং অবশিষ্টাংশ ৫ শতক প্রজা শর্তে দখলে রাখা হয়।
ভৌত অবস্থা (৮ শতক): ডিবি সড়ক সংলগ্ন সামনের ৩ শতক জমিতে ২২ হাত × ৯ হাত আয়তনের ৩টি পাকা মেঝের টিনশেড গুদামঘর এবং পেছনের ৫ শতক জমিতে টিন-কাঠের পাকা বসতঘর, বারান্দা, রান্নাঘর, বাথরুম ও টিউবওয়েল স্থাপন করে বিবাদী পরিবার শতবর্ষ ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে বসবাস করছেন। আদালতের এডভোকেট কমিশনারের সরেজমিন তদন্ত প্রতিবেদনেও এই ভৌত স্থাপনা ও দখলের সত্যতা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

ধারাবাহিক দাখিলা: সর্বশেষ ১৩৫০, ১৩৫১ ও ১৩৫৩ বাংলা সনের দাখিলা পাঠে পৃথকভাবে খাজনা আদায়ের স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। ১৯৪৩ সালের পর থেকে খাজনা আদায়কারী পূর্ণ চন্দ্রের তাগাদা শর্তে পৃথকভাবে খাজনা পরিশোধ করেন ময়েজ উদ্দিন গং ও আব্দুল গফুর মণ্ডল।
২. পূর্ণ চন্দ্র সরকারের ‘দ্বৈত ভূমিকা’ ও ২০০০ সালের ভুয়া সাফ কবলা দলিল : জমিদার মৃগেন্দ্রনাথ চাকীর খাজনা আদায়কারী ম্যানেজার ছিলেন পূর্ণ চন্দ্র সরকার। ভাড়াটিয়া চুক্তি (১৯৩৮): ২৯ নভেম্বর ১৯৩৮ তারিখের ১৭৩৮ নং রেজিস্ট্রি চুক্তিপত্র অনুযায়ী পূর্ণ চন্দ্র সরকার ও বিশ্বেশ্বর দাস বিবাদীদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে উক্ত ৮ শতক জমি ৭ বছরের জন্য (১৯৩৮–১৯৪৫) ভাড়া নেন।
আইনি অসংগতি ও প্রতারণা: ভূমিসংক্রান্ত স্থির আইনি নীতি হলো—’ভাড়াটিয়া বা মধ্যস্বত্বভোগী গোপনে কখনো মালিক হতে পারে না’। কিন্তু পূর্ণ চন্দ্র সরকার ১৯৪৩ সালের ৯৪৩ নং ভুয়া কবলা দলিলের মাধ্যমে নিজেকে মালিক হিসেবে সাজানোর চেষ্টা করেন। এরই ধারাবাহিকতায় তাঁর পুত্র গোবিন্দ চন্দ্র সরকার ২০০০ সালে একটি অবৈধ সাফ কবলা দলিলে ৫ শতক জমি হস্তান্তরের চক্রান্ত করেন, যা আইনগতভাবে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও জমি আত্মসাতের ফাঁদ মাত্র।
৩. ১৫.৫৬ শতককে ২১ শতক বানানোর গাণিতিক কারসাজি ও ওয়ারিশ ফাঁকি : বাদীপক্ষ (জোবেদা বেওয়ার ওয়ারিশ জাকিউল হক মানিক গং) বাটোয়ারা মামলায় যে ২১ শতক জমির মালিকানা দাবি করেছেন, তার মূল দলিলে রয়েছে চরম গাণিতিক জালিয়াতি: দলিলগত গরমিল: জফের মামুদ বেপারী দুটি পৃথক কবুলিয়তের মধ্যে ১ম দলিলে ২ কাঠা ২ ছটাক ১০ গণ্ডা (৩.৫৬ শতক) এবং ২য় দলিলে ১২ শতকসহ মোট ১৫.৫৬ (পৌনে ১৬) শতক জমি পত্তন পান। কিন্তু বাদীপক্ষ এই ১৫.৫৬ শতক জমিকে চালিয়াতি করে ২১ শতক হিসেবে সাজিয়ে দেওয়ানি আদালতে মামলা ঠুকে দেয়।
ওয়ারিশ ফাঁকি ও খাস জমি: আসল ওয়ারিশদের বাদ দিয়ে ওয়ারিশ ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। এমনকি উক্ত ২৪ শতক জমির মধ্যে ০.৫৬০০ শতক জমি সরকারের খাস খতিয়ানভুক্ত (বিআরএস ১ নং খতিয়ান, ৫৮৯ হাল দাগ), যা গোপন করে অতিরিক্ত জমি দাবি করা হয়েছে। তবে খাস জমি অন্তর্ভুক্ত হওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনা ও বিস্তারিত তথ্য পরের খণ্ডে তুলে ধরা চেস্টা করবো।

জরিপকালীন রেকর্ড বিভ্রান্তি (এস.এ, আর.এস ও বি.আর.এস): এস.এ ও আর.এস জরিপে ২৯০ নং খতিয়ানে ৩ শতক জমির প্রতিফলন থাকলেও ২৯১ নং খতিয়ানে জালিয়াতি করে ২১ শতক রেকর্ডভুক্ত করানো হয়। বি.আর.এস জরিপ আমলেও একই ভুল ও বিভ্রান্তির ধারাবাহিকতায় মরহুম জহুরুল ইসলামের নামে ০.৭৫ শতক এবং চাচার ০.২৫ শতক (মোট ১ শতক), আর অপরাপর শরিক সমশের উদ্দিন ও আব্দুল কাদের মণ্ডলের ওয়ারিশদের নামে ১ শতক করে ২ শতক রেকর্ড হয়।
এতে ৫ শতক জমি এস.এ রেকর্ডভুক্ত হওয়া থেকে বঞ্চিত হয়; মূলত ২৯০ খতিয়ানে ময়েজ উদ্দিন গংদের নামে ৩ শতক যৌথ অংশ এবং ৫ শতক এককভাবে আব্দুল গফুর মণ্ডলের নামে রেকর্ড হওয়া উচিত ছিল।
আইনি নীতি (Record vs Title): সি.এস ৩০৩ খতিয়ান থেকে এস.এ ২৯০, ২৯১ নং খতিয়ান কিংবা বি.আর.এস জরিপে ভুল এন্ট্রি হলেও স্থির আইনি নীতি হলো—’Record of Rights does not create title’ (খতিয়ান বা রেকর্ড কখনোই মূল স্বত্ব বা মালিকানা সৃষ্টি করে না)।
৪. উত্তরাধিকার, হস্তান্তর ও বিরুদ্ধ দখল (Adverse Possession) : ময়েজ উদ্দিনের মৃত্যুর পর তাঁর চার পুত্র পৈতৃক হিস্যায় ১ শতক জমি পান এবং তা পৃথক রেজিস্ট্রি দলিল মূলে ১৯৬৯ সালে জহুরুল ইসলাম মণ্ডলের কাছে হস্তান্তর করেন। এছাড়া প্রজা শর্তে ৫ শতক জমির একক মালিকানা অর্জন করায় আব্দুল গফুর মণ্ডল ১৯৮১ সালে রেজিস্ট্রি দলিলে তা পুত্র জহুরুল ইসলাম মণ্ডলের নিকট হস্তান্তর করেন। ফলে পিতা ও চাচাদের হস্তান্তরে জহুরুল ইসলাম মণ্ডল মোট ৬ শতক জমিতে বৈধ মালিক ও নিরবচ্ছিন্ন দখলদার হয়ে গুদামের সাথে আইনী সেরেস্তা ও পিছনের টিনসেড বাড়ি ঘরে বসবাস করতে থাকেন (অবশিষ্ট ২ শতকের দুটি গুদাম ঘরে সমশের উদ্দিন মণ্ডল ও আব্দুল কাদের মণ্ডলের ওয়ারিশদের ভোগ দখলে)।
১৯৩০–১৯৩৬ সালে বৈধ পত্তন মূলে ভোগদখল শুরুর পর থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৭-৮ দশকে বাদীপক্ষ বিবাদীদের প্রকাশ্য ও নিরবচ্ছিন্ন দখলে কোনো বাধা দেয়নি। দেওয়ানি আইনের নীতি অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় নীরব থেকে হঠাৎ ভুয়া সাফ কবলা দলিল দিয়ে মামলা করা আইনত অটেকসই। বিকল্প আইনি যুক্তিতে বিবাদীপক্ষ ‘বিরুদ্ধ দখল’ (Adverse Possession)-এর আইনি সুরক্ষায় সম্পূর্ণ অধিকারপ্রাপ্ত।
উপসংহার ও আদালতের কাছে প্রত্যাশা
বিজ্ঞ সিনিয়র সহকারী জজ আদালত, সাদুল্লাপুরের ৫২/২০০৪ নং বাটোয়ারা মামলার নথিপত্র, আরজি ও গাণিতিক হিসাব বিশ্লেষণে স্পষ্ট যে—বাদীপক্ষের ২১ শতক জমির দাবিটি মূলত ১৫.৫৬ শতককে ২১ শতক বানানোর গাণিতিক কারসাজি, ভাড়াটিয়া সূত্রের ভুয়া সাফ কবলা দলিল এবং ওয়ারিশ ফাঁকির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক সাজানো নাটক।

আইন ও সাক্ষ্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বাদীদের এই সাজানো চক্রান্ত শেষ পর্যন্ত তাদের নিজদের জন্যই আইনি জটিলতা তৈরি করবে। আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় ১৯৩৮ সালের ভাড়ার ডিড, এডভোকেট কমিশনারের নিরপেক্ষ রিপোর্ট, ধারাবাহিক খাজনা রসিদ ও মূল দলিলের বাস্তব পরিমাপ পর্যালোচিত হলে বাদীদের সাজানো বাটোয়ারা মামলা খারিজ হবে এবং বিবাদীপক্ষের শতবর্ষের ভোগদখলীয় ৫ শতক বসতবাড়ি ও ৩ শতক গুদামঘরের স্বত্ব ও দখল সুরক্ষিত হবে—এটাই অনুসন্ধানী আইনি বিশ্লেষণ ও ন্যায়বিচারের দাবি।
বিশেষ দ্রষ্টব্য ও লেখকের বক্তব্য : বাদীপক্ষের প্রতারণা ও সূক্ষ্ম কৌশল অনুসন্ধানে অত্যন্ত স্পষ্ট। তবে এই বিশ্লেষণে আগাম কোনো আইনি রায় দেওয়া হচ্ছে না, কিংবা বিচারাধীন মামলা সম্পর্কে আদালতকে বিভ্রান্ত করার কোনো উদ্দেশ্য নেই। নিজেকে ভুক্তভোগী দাবি করে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য এই লেখা নয়; বরং একজন শিক্ষানবিশ আইনজীবী হিসেবে প্রাপ্ত নথিপত্র গভীরভাবে পাঠ এবং একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক হিসেবে সত্য অনুসন্ধানের দায়বদ্ধতা থেকেই ভূমি বিরোধের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

এখানেই জালিয়াতির শেষ নয়। মূল মালিকানার হিস্যা অংশে ষোলো আনা গোঁজামিলের পাশাপাশি নালিশী ২৪ শতক জমির মধ্যে ০.৫৬০০ শতক (আধা শতকের বেশি) জমি ইতোমধ্যে বিআরএস ১ নং খতিয়ানের ৫৮৯ হাল দাগে সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত হয়েছে। মুখে নয়; দলিল, খতিয়ান, দাখিলা ও সরেজমিন দখলের অকাট্য প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়েই সত্য উন্মোচিত হবে—বিজ্ঞ আদালতের চূড়ান্ত বিচারের অপেক্ষায়।)
প্রতিবেদক: জিল্লুর রহমান মণ্ডল (পলাশ) গণমাধ্যমকর্মী, এম.এ (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), এলএলবি; শিক্ষানবিশ আইনজীবী, গাইবান্ধা।
Leave a Reply