নিজস্ব প্রতিবেদক :: রংপুরে ক্রমাগত বেড়ে চলা অপরাধ ও নৃশংসতায় চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। গত ১০ দিনের ব্যবধানে নগরের তাজহাট, মাছুয়াপাড়া ও হারাগাছ এলাকায় তিনটি পৃথক ঘটনায় মোট ছয়জন খুন হয়েছেন। এর মধ্যে একই পরিবারের চারজনকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা না কাটতেই, হারাগাছে আরও এক যুবকের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার হওয়ায় এই আতঙ্ক আরও তীব্র রূপ নিয়েছে। পর পর এসব লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা ও নগরবাসীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৩ আগস্ট সকালে রংপুর নগরের তাজহাট আনসারি মোড় এলাকার একটি তালাবদ্ধ রিকশা গ্যারেজ থেকে আবদুর রহমান নামের এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। গ্যারেজে থেকে রিকশা দেখাশোনা করতেন তিনি। বাহির থেকে তালা মারা শাটারে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পুলিশ তালা কেটে ভেতরে প্রবেশ করে এবং তার মরদেহ উদ্ধার করে। পরবর্তীতে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
এদিকে প্রথম ঘটনার কয়েক দিন পর ২২ আগস্ট গভীর রাতে নগরের মাছুয়াপাড়ায় ঘটে আরও এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড। সেখানে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীকে নিজ ঘরের ভেতর হত্যা করা হয়।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনায় জড়িত সন্দেহে প্রতিবেশী মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস নামের দুই তরুণকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রথমে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। পরে পরিচয় আড়াল করতে পরিবারের বাকি তিন সদস্যকেও নির্মমভাবে হত্যা করে তারা। ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে চালিয়ে দিতে হত্যাকাণ্ডের পর ঘরের আলমারি ও ড্রয়ারের মালামাল তছনছ করা হয়েছিল বলেও জানায় পুলিশ।
সর্বশেষ রবিবার (২৩ আগস্ট) রাতে রংপুর মেট্রোপলিটন হারাগাছ থানা এলাকার চরচতুরা গ্রামের একটি নির্জন সড়ক থেকে আবু সিদ্দিক (৩৫) নামের এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশ মরদেহটি উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।

পুলিশ ও স্বজনদের মতে, রবিবার সন্ধ্যার পর বাড়ি থেকে বের হয়ে লালমনিরহাট সদরের বাজারে যান সিদ্দিক। পরবর্তীতে রাত ৯টার দিকে চরচতুরা গ্রামের এক নির্জন সড়কে তার ক্ষতবিক্ষত মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয়রা। খবর পেয়ে হারাগাছ থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে এ হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ জানাতে পারেনি পুলিশ।
একই সাথে রংপুরের সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহল ও পুলিশের পক্ষ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর রংপুর মহানগর সভাপতি অ্যাডভোকেট জোবায়দুল ইসলাম বুলেট বলেন, ‘রংপুরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিন দিন অবনতি ঘটছে এবং পুলিশ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। মূল মাদক কারবারিদের না ধরে শুধু সেবনকারীদের গ্রেপ্তার করে মামলার সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। খুন হওয়ার পর আসামি ধরায় কোনো কৃতিত্ব নেই; জীবন রক্ষাই প্রধান কাজ হওয়া উচিত।’

একই প্রসঙ্গে কলেজ শিক্ষক আব্দুল আজিজ জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও রাজনীতিকদের আরও সোচ্চার হতে হবে। মাদকের লেনদেনের পেছনে থাকা মূল প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের অবিলম্বে আইনের আওতায় না আনলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
তবে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ। তিনি জানান, মাছুয়াপাড়ার ঘটনাটি কোনো ডাকাতি ছিল না। পুলিশ দ্রুততম সময়ে হত্যার রহস্য উন্মোচন করেছে এবং গ্রেপ্তার আসামিদের দেওয়া জবানবন্দির সঙ্গে তদন্ত ও চিকিৎসকদের তথ্যের পূর্ণ মিল পাওয়া গেছে।
Leave a Reply