বিজ্ঞাপন:
সংবাদ শিরোনাম:
ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যাওয়া উচিত হয়নি: ট্রাম্প চারটি পুকুরে বিষ দিয়ে অর্ধকোটি টাকার মাছ নিধন, নিঃস্ব চাষি হারানো ঐতিহ্যের খোঁজে সুন্দরগঞ্জে ব্যতিক্রমী ঈদ উৎসব ব্রাজিল ভক্তদের মোটর র‍্যালিতে আর্জেন্টিনা ভক্তদের 7UP বিতরণ গাইবান্ধায় চামড়ার বাজারে ধস, শত শত চামড়া ফেলে গেলেন ব্যবসায়ীরা কালিয়াকৈরে “ঈদের তিন দিন পার হলেও মহাসড়ক থেকে অপসারণ করা হয়নি কোরবানির বর্জ্য তিস্তা কে আর খাদেম উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯৬ ব্যাচের পূর্ণমিলনী ২০২৬ অনুষ্ঠিত গাজীপুরে পিস্তল গুলি প্রাইভেটকার সহ গ্রেফতার ১ জন কোরবানির মাংস পেয়ে তৃপ্তির হাসি,বেটি-জামাইয়োক নিয়ে তৃপ্তি করে গোশতো-ভাত খামো সন্তানের জন্ম দিলেন মানসিক ভারসাম্যহীন নারী, বাবা কে?
হারানো ঐতিহ্যের খোঁজে সুন্দরগঞ্জে ব্যতিক্রমী ঈদ উৎসব

হারানো ঐতিহ্যের খোঁজে সুন্দরগঞ্জে ব্যতিক্রমী ঈদ উৎসব

রাশেদুল ইসলাম রাশেদ,স্টাফ রিপোর্টার: ঈদের আনন্দ তখনও ম্লান হয়নি। গ্রামের আকাশ-বাতাসে লেগে আছে উৎসবের আমেজ। সেই আনন্দকে আরও বর্ণিল করে তুলতে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে আয়োজন করা হয় ব্যতিক্রমধর্মী এক ঈদ পুনর্মিলনী উৎসবের। দিনব্যাপী এ আয়োজনে গ্রামীণ খেলাধুলা, প্রীতি ফুটবল ম্যাচ, গুণীজন সংবর্ধনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মিলনমেলায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

শনিবার (৩০ মে) উপজেলার মনিরাম পাটোয়ারীপাড়া কৃষি কলেজ মাঠে মনিরাম শান্তিরক্ষা যুব এন্ড ক্রীড়া উন্নয়ন ক্লাবের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় ঈদ পুনর্মিলনী, আজীবন সদস্য সম্মাননা, গুণীজন সংবর্ধনা ও গ্রামীণ সংস্কৃতিভিত্তিক নানা আয়োজন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর, তরুণ ও প্রবীণদের পদচারণায় উৎসবের রূপ নেয় পুরো মাঠ।

সকাল থেকেই আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে মানুষ ভিড় জমাতে শুরু করেন অনুষ্ঠানস্থলে। কেউ মোটরসাইকেলে, কেউ অটোরিকশায়, আবার কেউ পরিবার-পরিজন নিয়ে হেঁটেই চলে আসেন। দুপুরের আগেই মাঠজুড়ে নেমে আসে মানুষের ঢল। চারপাশে বসে নানা ধরনের খাবারের দোকান। শিশুদের হাতে রঙিন বেলুন, তরুণদের হাতে মোবাইল ফোন আর প্রবীণদের মুখে স্মৃতিচারণ—সব মিলিয়ে যেন ফিরে আসে গ্রামবাংলার চিরচেনা উৎসবের আবহ।

কোরআন তেলাওয়াত ও অতিথিদের আগমনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর শুরু হয় গ্রামীণ খেলাধুলার জমজমাট পর্ব। হাঁস ধরা খেলায় প্রতিযোগীদের প্রাণপণ চেষ্টা আর বারবার হাত ফসকে যাওয়া হাঁস দেখে দর্শকদের মধ্যে হাসির রোল পড়ে যায়। চোখ বেঁধে হাঁড়ি ভাঙা খেলায় অংশগ্রহণকারীদের মজার মজার কাণ্ডে মাঠজুড়ে তৈরি হয় আনন্দঘন পরিবেশ।

এছাড়া মোরগ লড়াই, হাডুডু, দলীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও শিশুদের জন্য বুদ্ধিপরিচয়মূলক নানা আয়োজন দর্শকদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করে। নারীদের জন্য বালিশ খেলা ও মিউজিক্যাল চেয়ার প্রতিযোগিতাও ছিল বিশেষ আকর্ষণ। প্রথমে কিছুটা দ্বিধা থাকলেও পরে উচ্ছ্বাস নিয়ে অংশ নেন নারীরা।

অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল প্রবীণদের জন্য বিশেষ কুইজ প্রতিযোগিতা। ৬০ বছরের বেশি বয়সী অংশগ্রহণকারীরা মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রশ্নের উত্তর দিলে দর্শকরাও করতালিতে তাদের উৎসাহিত করেন। অনেকেই বলেন, এমন আয়োজন এখন গ্রামাঞ্চলে খুব কমই দেখা যায়।

দ্বিতীয় অধিবেশনে অনুষ্ঠিত হয় আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের প্রীতি ফুটবল ম্যাচ। খেলা ঘিরে মাঠে তৈরি হয় ছোট্ট এক স্টেডিয়ামের আবহ। দুই দলের সমর্থকদের স্লোগান, খুনসুটি ও উচ্ছ্বাসে জমে ওঠে পুরো পরিবেশ। খেলা শেষে দুই দলের খেলোয়াড়দের কোলাকুলিতে ফুটে ওঠে সম্প্রীতির অনন্য চিত্র।

বিকেলে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভা ও গুণীজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মনিরাম শান্তিরক্ষা যুব এন্ড ক্রীড়া উন্নয়ন ক্লাবের সভাপতি মো. মাসুদ পারভেজ পাটোয়ারী।

এতে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ক্লাবের সাবেক সভাপতি ও বামনডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল জব্বার এবং সাবেক চেয়ারম্যান ও শিক্ষক মো. নজমুল হুদা।

বক্তারা বলেন, ঈদ কেবল আনন্দের উৎসব নয়, এটি মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করে। তরুণ প্রজন্মকে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখতে এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

চেয়ারম্যান মো. আব্দুল জব্বার বলেন, “গ্রামের মানুষ এখন আগের মতো একত্রিত হয় না। এ ধরনের আয়োজন মানুষকে আবারও কাছাকাছি নিয়ে আসে। সামাজিক সম্প্রীতি ও সুস্থ বিনোদনের জন্য এমন উদ্যোগ অত্যন্ত প্রয়োজন।”

সাবেক চেয়ারম্যান নজমুল হুদা বলেন, “গ্রামীণ খেলাধুলা আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। নতুন প্রজন্মকে এসবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে না পারলে একসময় এগুলো শুধুই স্মৃতিতে রয়ে যাবে।”

আয়োজক কমিটির সদস্য মিশু পারভেজ পাটোয়ারী বলেন, “ঈদের আনন্দ সবাই মিলে ভাগাভাগি করুক, এটাই ছিল আমাদের মূল উদ্দেশ্য। পাশাপাশি হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ সংস্কৃতি নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে চেয়েছি।”

স্থানীয় বাসিন্দা জিয়াউর রহমান বলেন, “অনেক বছর পর গ্রামের মাঠে এমন প্রাণবন্ত আয়োজন দেখলাম। সকাল থেকে মানুষ আসছে, কেউ ফিরতে চাইছে না। মনে হচ্ছে ছোটবেলার দিনগুলো আবার ফিরে এসেছে।”

গৃহিণী মুন্নি বেগম বলেন, “বাচ্চাদের নিয়ে সকালেই এসেছি। মেয়েদের জন্য আলাদা খেলার ব্যবস্থা থাকায় খুব ভালো লেগেছে। অনেক দিন পর এমন আনন্দ করলাম।”

সন্ধ্যা নামতেই শুরু হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। গান, কবিতা ও বিভিন্ন পরিবেশনায় মুগ্ধ হন দর্শকরা। মোবাইল ফোনের আলো, করতালি আর উচ্ছ্বাসে আলোকিত হয়ে ওঠে পুরো মাঠ। পরে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।

রাত গভীর হলেও কমেনি মানুষের উপস্থিতি। কেউ গল্পে মগ্ন, কেউ স্মৃতি ধরে রাখতে ছবি তুলতে ব্যস্ত। ঈদের এই পুনর্মিলনী তাই কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং হয়ে ওঠে গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য, সম্প্রীতি ও মিলনমেলার এক অনন্য উদযাপন।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ওয়েবসাইট এর কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি।
Design & Development BY : ThemeNeed.com