অনলাইন ডেস্ক: ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) টানা আন্দোলনের মুখে অবশেষে পদত্যাগ করলেন ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস এবং শিক্ষাক্ষেত্রে নানা দুর্নীতির অভিযোগে শুরু থেকেই তাঁর পদত্যাগের দাবি জানিয়ে আসছিল সিজেপি। সরকারের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের আলোচনার আবহের মধ্যেই শেষ পর্যন্ত ইস্তফা দিতে বাধ্য হলেন এই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী।

নিট প্রশ্নফাঁস ও দুর্নীতি ইস্যুতে নতুন দিল্লিতে দীর্ঘদিন ধরে টানা অবস্থান-বিক্ষোভ চালিয়ে আসছিলেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের পরিষ্কার বার্তা ছিল, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ছাড়া কোনো অবস্থাতেই তাঁরা রাজপথ ছাড়বেন না এবং এ বিষয়ে কোনো প্রকার আপস বা বোঝাপড়া করা হবে না। এই দুর্নীতির সমস্ত দায়ভার মন্ত্রীকেই নিজের কাঁধে নিতে হবে বলে তাঁরা দাবি জানান। আন্দোলন প্রশমিত করতে সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সিজেপির আন্দোলনকারীদের দুই দফায় আলোচনাও হয়। কিন্তু আন্দোলনকারীরা তাঁদের দাবিতে অনড় থাকেন।
পরিস্থিতি সামাল দিতে শনিবার বিকেলে সরকারের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের তৃতীয় দফার বৈঠক নির্ধারিত ছিল। তবে সেই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের আগেই ইস্তফা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ধর্মেন্দ্র প্রধান।

নিজের এই পদত্যাগের খবর ঘোষণা করে শনিবার দুপুরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দেন ধর্মেন্দ্র। পদত্যাগী শিক্ষামন্ত্রী তাঁর সেই বার্তায় লিখেছেন, ‘গত দশ দিনের ঘটনায় দুঃখিত।’
পদত্যাগপত্রে ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেন, ‘আমার তরুণ বন্ধুরা, বিগত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আমি শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের কাজে নিজেকে নিবেদিত রেখেছি। আমি সর্বদা বিশ্বাস করেছি যে একটি শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং দূরদর্শী শিক্ষা ব্যবস্থাই একটি সমৃদ্ধ জাতির মূল ভিত্তি।’
‘আমি দেশের যুবসমাজের আশা-আকাঙ্ক্ষা, আবেগ এবং ন্যায্য প্রত্যাশাকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করি। ভারতের তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন পূরণ করা আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে একটি নৈতিক অঙ্গীকার ছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নেতৃত্বে দেশকে সেবা করার সুযোগ দেওয়ার জন্য আমি তাঁর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
তবে, ২০২৬ সালের ৩ মে অনুষ্ঠিত নিট-ইউজি পরীক্ষায় কিছু অনিয়মের বিষয়টি সামনে আসে। বিষয়টি তৎক্ষণাৎ আমলে নিয়ে ভারত সরকার এর তদন্তভার সিবিআই-এর (CBI) হাতে তুলে দেয়, পরীক্ষাটি বাতিল করে এবং পুনরায় পরীক্ষা গ্রহণের নতুন তারিখ ঘোষণা করে। পাশাপাশি আগামী বছর থেকে পরীক্ষাটি কম্পিউটার ভিত্তিক (CBT) পদ্ধতিতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।’

এই পুরো সময়জুড়ে আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার ছিল ২০ লক্ষেরও বেশি শিক্ষার্থীর পরীক্ষা যেন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় তা নিশ্চিত করা। ভারত সরকার, রাজ্য সরকার এবং বিশেষ করে জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে ‘হোল-অফ-গভর্নমেন্ট’ (সম্পূর্ণ সরকারি উদ্যোগ) পদ্ধতির মাধ্যমে তা অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সহযোগিতায় ২০২৬ সালের ২১ জুন পরীক্ষাটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
প্রথম দিন থেকেই আমি এর পূর্ণ দায়ভার নিয়েছি এবং পরিস্থিতি থেকে কখনোই মুখ ফিরিয়ে নিইনি। কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর সম্ভাবনা যেন ‘পরীক্ষা মাফিয়াদের’ কারণে নষ্ট না হয় কিংবা কোনো শিক্ষার্থীর প্রতি যেন কোনো অবিচার না ঘটে, সে ব্যাপারে আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম।
গত ১৬ জুলাই প্রকাশিত নিট-ইউজি পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক ছিল, যেখানে পিছিয়ে পড়া পটভূমি থেকে আসা অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী সাফল্য অর্জন করেছে।
তবে এই সময়েও দায়িত্বশীল পদে থাকা কিছু ব্যক্তি শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করতে এবং প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করতে চেষ্টা করেছেন—যা আমাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে।

আমি সর্বদা আমাদের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর অটুট বিশ্বাস রেখেছি এবং তরুণ সমাজের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষাকে গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছি। তাঁরা কেবল ভারতের ভবিষ্যৎ নন; তাঁরাই নতুন ও উন্নত ভারতের রূপকার। গত দশ দিনের ঘটনায় আমি অত্যন্ত ব্যথিত। এটি আমার কাছে কোনো ব্যক্তিগত মর্যাদার লড়াই নয়।’
মন্ত্রী বলেন, ‘ভারতের যুবশক্তিই এই দেশের প্রকৃত শক্তি।
দেশের যুবসমাজ যেন কোনো বিভ্রান্তির জালে আটকে না পড়ে—সেটিই আমার মূল সংকল্প।
যন্তর মন্তরসহ সারা দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে—যাতে কোনো দেশবিরোধী শক্তি এর সুযোগ নিতে না পারে, জাতীয় সংহতি বজায় থাকে, কোনো ভারতীয় শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ যেন আইনি জটিলতায় আটকে না পড়ে এবং আমাদের সন্তানেরা যেন পড়াশোনায় মনোনিবেশ করে ক্যারিয়ার গঠনে মনোযোগ দিতে পারে—সেটি নিশ্চিত করতে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি।

শ্রদ্ধেয় প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা, বিশ্বাস এবং ধারাবাহিক সমর্থনের জন্য আমি তাঁর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। পাশাপাশি মন্ত্রিপরিষদের আমার সকল সম্মানিত সহকর্মী, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং যাঁদের সাথে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি, তাঁদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। দেশের সেবা করা আমার জীবনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার; আমি চিরকাল এই কাজে নিবেদিত থাকব।
প্রভু জগন্নাথের কৃপায়, আমি ভবিষ্যতেও ভারতমাতা, ওড়িশার জনগণ এবং দেশের যুবসমাজের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে সম্ভাব্য সব উপায়ে নিজেকে উৎসর্গ করে যাব।’
Leave a Reply