তাহমিনা আক্তার,ঢাকা: রাজধানী ছাড়ছেন মানুষ। পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দ প্রিয়জনদের সঙ্গে ভাগাভাগি করতেই এই যাত্রা। রোববার সরকারি অফিস-আদালতে শেষ কার্যদিবস ছিল। তাই এদিন বাস, লঞ্চ ও ট্রেনে যাত্রীচাপ দেখা গেছে। যাত্রীর তুলনায় বাস কম হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে অনেককে। রাজধানীর গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনালে সন্ধ্যায় গাড়ির জন্য যাত্রীদের অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। অভিযোগ আছে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়েরও। তবে যারা আগাম টিকিট সংগ্রহ করেছেন তারা অনেকটা নির্বিঘ্নে বাড়ির উদ্দেশে রওয়ানা হয়ে গেছেন। একই অবস্থা ট্রেনেও। প্রতিটি ট্রেনে উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। তবে তুলনামূলক চাপ কম ছিল লঞ্চে। পরিবহণ সংশ্লিষ্টরা জানান, আজ সোমবার শিল্পকারখানা ও বেসরকারি অফিস বন্ধ হওয়ার পর যাত্রীচাপ আরও বাড়বে।

রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা যায়, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টার্মিনালে যাত্রীচাপ ব্যাপকভাবে বাড়তে থাকে। যাত্রীদের তুলনায় দূরপাল্লার বাসের সংখ্যা কম থাকায় অনেকে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করছেন। বিকল্প না থাকায় ভোগান্তি মেনেই বাড়ি ফিরছেন তারা। স্বজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগির করতে শত কষ্ট সইতে যেন প্রস্তুত তারা।
অনন্যা পরিবহণের কাউন্টার ম্যানেজার মো. জাহাঙ্গীর বলেন, ‘সরকারি অফিস ছুটি হওয়ায় যাত্রীচাপ বেড়েছে। যাত্রীবোঝাই হলেই আমরা একের পর এক গাড়ি ছেড়ে দিচ্ছি।’

ময়মনসিংহ যাওয়ার জন্য ইউনাইটেড ট্রান্সপোর্টের টিকিট কাটেন যাত্রী ফারুক হোসেন। তিনি জানান, স্বাভাবিক সময়ের মতোই কাউন্টারে গিয়ে টিকিট কেটেছেন। তবে যাত্রীচাপ বেশি।
ইউনাইটেড ট্রান্সপোর্টের বাসের আরেক যাত্রী আলাউদ্দিন জানান, ঘণ্টাখানেক আগে তিনি টিকিট কেটেছেন। তবে বাস এখনো কাউন্টারে আসেনি। বাসটি আসতে আরও আধা ঘণ্টা সময় লাগবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এদিকে ঈদযাত্রাকে নিরাপদ, টিকিট কালোবাজারি ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে মহাখালী টার্মিনাল এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সরব উপস্থিতি দেখা গেছে। মহাখালী বাস মালিক সমিতির কার্যকরী সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘ঈদযাত্রা নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে টার্মিনালের ভেতর-বাইরে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মালিক সমিতির পক্ষ থেকে কমিটি গঠন করা হয়েছে।’
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক গুলশান বিভাগের মহাখালী জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. রাসেল রানা জানান, বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অতিরিক্ত ফোর্স নিযুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি অস্থায়ী কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে। সাদা পোশাকেও লোকজন আছে যাতে অতিরিক্ত ভাড়া না নিতে পারে।
তবে দক্ষিণাঞ্চলে যাতায়াতের অন্যতম দ্বার ঢাকা নদী বন্দরে তুলনামূলক যাত্রীচাপ কম ছিল। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মুহম্মদ মোবারক হোসেন জানান, ঈদ উপলক্ষ্যে সাধারণত যে যাত্রীচাপ থাকার কথা সেই তুলনায় কম। তবে আগের চেয়ে যাত্রীসংখ্যা অনেক বেড়েছে। আমরা যাত্রীদের নিরাপত্তাব্যবস্থা দেখাভাল করছি। পাশাপাশি যাত্রীসেবায় ফ্রি কুলি, ট্রলি ও হুইলচেয়ার সুবিধাও রাখা হয়েছে। কুলিদের হয়রানি বন্ধে ২০০ জন স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন করা হয়েছে।

ট্রেনেও বাড়ছে যাত্রীচাপ : এদিনই ট্রেনেও উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় দেড় লাখ মানুষ রাজধানী ছাড়ছেন। প্রতিদিন ৪৩টি আন্তঃনগর এবং ২৭টি মেইল, লোকাল ও কমিউটার ট্রেন ছাড়ছে। আজ ও আগামীকাল ভিড় আরও তীব্র হবে বলে জানিয়েছেন রেল সংশ্লিষ্টরা। এদিকে বিনাটিকিটি ও ট্রেনের ছাদে ওঠা কিছুতেই রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। ছাদে উঠে ট্রেন ভ্রমণ-মুহূর্তেই আনন্দের এ যাত্রা শোকে পরিণত হতে পারে। এমন বার্তা দিয়ে কমলাপুর স্টেশন ম্যানেজার সাধারণ যাত্রীদের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বলেছেন, ট্রেনের ছাদ, ইঞ্জিনে না ওঠার জন্য।
রোববার সকালে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন পরিদর্শন করেন রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে মানুষের বাড়ি ফেরার প্রথম পছন্দ ট্রেন। ট্রেন জার্নিটাই যাত্রীদের কাছে একটা আলাদা প্রাধান্য পায়। এই চাহিদার কারণে বেশকিছু সীমাবদ্ধতাও তৈরি হয়ে যায়। কারণ যাত্রীর চাহিদা প্রচুর; কিন্তু যাত্রীদের যাতায়াত নিশ্চিত করার জন্য আমাদের যে ট্রেনের সংখ্যা তা পর্যাপ্ত নয়।’

মন্ত্রী বলেন, ‘ট্রেনের পরিবেশ ও যাত্রীদের সন্তুষ্টি বেশ ভালো মনে হয়েছে। ট্রেনের পরিচ্ছন্নতা বজায় আছে এবং সিটিং ক্যাপাসিটি অনুসারেই যাত্রীরা যাচ্ছেন, যদিও যাত্রীদের কথা বিবেচনা করে আমরা ক্যাপাসিটির বাইরেও ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত টিকিট দিয়েছি।’ রোববার সকাল থেকে তিনটি ট্রেন দেরিতে ছেড়েছে বলে জানান মন্ত্রী। এর মধ্যে একটি ট্রেন হুইল স্লিপ করার কারণে দেরিতে আসে।
আজ থেকে বিমানবন্দর স্টেশনে দাঁড়াবে না ঢাকাগামী ৯ ট্রেন : ট্রেনের সময়ানুবর্তিতা বজায় রাখা এবং শিডিউল বিপর্যয় নিরসনে ঢাকাগামী ৯টি আন্তঃনগর ট্রেনের বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনে যাত্রাবিরতি বাতিল করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ২৫ মে থেকে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত ঢাকাগামী একতা, দ্রুতযান, পঞ্চগড়, নীলসাগর, কুড়িগ্রাম, লালমনি, রংপুর, চিলাহাটি ও বুড়িমারী এক্সপ্রেস ট্রেনগুলোর ঢাকা বিমানবন্দর স্টেশনে যাত্রাবিরতি থাকবে না। অন্যদিকে বিনা টিকিটের যাত্রী চলাচল বন্ধে ঢাকা, বিমানবন্দর, জয়দেবপুর, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, সিলেট, রাজশাহী ও খুলনাসহ বড় বড় স্টেশনে জিআরপি, আরএনবি, বিজিবি, স্থানীয় পুলিশ ও র্যাবের সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে।
Leave a Reply