স্টাফ রিপোর্টার: পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে পশুবাহী ট্রাক থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল থেকে রাজধানী ও চট্টগ্রামমুখী পশুবাহী ট্রাকগুলোকে লক্ষ্য করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একাধিক চাঁদাবাজ চক্র। ট্রাকচালকদের অভিযোগ, পথে পথে বিভিন্ন স্থানে গাড়ি থামিয়ে পুলিশ পরিচয়ধারী ব্যক্তি, রাজনৈতিক কর্মী ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা চাঁদা আদায় করছেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে কাগজপত্র যাচাইয়ের নামে হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এমনকি শারীরিক লাঞ্ছনার ঘটনাও ঘটছে।

রাজশাহী থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত চাঁদার ‘রুট’:
উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বড় পশুর মোকাম রাজশাহী সিটি হাট থেকে প্রতিদিন শত শত পশুবাহী ট্রাক দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যায়। ট্রাকচালকদের অভিযোগ, রাজশাহী থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত প্রায় ৫০০ কিলোমিটার পথে অন্তত ২০টি স্থানে তাদের থামিয়ে টাকা আদায় করা হয়।
চালকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন হাইওয়ে পয়েন্টে ট্রাকপ্রতি কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। কোথাও কোথাও গাড়ির কাগজপত্র পরীক্ষা, মামলা দেওয়ার ভয় কিংবা দীর্ঘ সময় আটকে রাখার অভিযোগও রয়েছে। ফলে প্রতিটি ট্রাক থেকে মোট সাত থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে বলে দাবি তাদের।
চাঁদাবাজির প্রভাব পড়ছে গরুর দামে:
ব্যবসায়ীরা বলছেন, পথে পথে চাঁদা দেওয়ার কারণে পরিবহণ ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত কুরবানির পশুর বাজারেও পড়ছে। ফলে বাড়তি মূল্য গুনতে হচ্ছে সাধারণ ক্রেতাদের।

রাজশাহীর এক ট্রাক মালিক বলেন, রাজশাহী থেকে ঢাকা বা চট্টগ্রামে পশু পরিবহণে ভাড়া তুলনামূলক ভালো পাওয়া গেলেও পথে চাঁদা ও অন্যান্য খরচ মেটাতে গিয়ে লাভ কমে যাচ্ছে। চাঁদাবাজি বন্ধ হলে ব্যবসায়ীরা যেমন উপকৃত হতেন, তেমনি কমত হয়রানিও।
সাতক্ষীরা ও রাঙামাটিতেও একই অভিযোগ:
শুধু উত্তরাঞ্চল নয়, সাতক্ষীরা ও রাঙামাটিসহ বিভিন্ন এলাকাতেও পশুবাহী যানবাহন থেকে ‘লাইন খরচ’, ‘শ্রমিক খরচ’, ‘ম্যানেজ’ কিংবা ‘চেকিং’-এর নামে টাকা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সাতক্ষীরার বিভিন্ন সড়ক ও প্রবেশপথে ট্রাক থামিয়ে কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ী ও চালকরা। টাকা না দিলে ট্রাক আটকে রাখা বা ভয়ভীতি দেখানোর ঘটনাও ঘটছে বলে দাবি তাদের।

রাঙামাটিতেও পাহাড়ি এলাকা থেকে পশু পরিবহণের সময় বিভিন্ন ঘাট ও সড়কে টোল ও চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, রাঙামাটি থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত যাত্রাপথে একাধিক স্থানে টাকা দিতে হয়।
গভীর রাতে ছিনতাই আতঙ্ক:
ট্রাকচালকদের অভিযোগ, গভীর রাতে মহাসড়ক ও ফ্লাইওভারে ছিনতাইকারীদের তৎপরতাও বেড়ে যায়। ঢাকা বাইপাস, যাত্রাবাড়ী, মহাখালী ও গুলিস্তান এলাকায় ট্রাকের গতি কমলে দুর্বৃত্তরা গাড়িতে উঠে চালকদের ভয় দেখিয়ে টাকা, মোবাইল ফোন ও মালামাল ছিনিয়ে নেয়।
সম্প্রতি ঘোড়াশাল এলাকায় গরুবাহী একটি ট্রাক থামিয়ে চালককে আহত করে ট্রাক ও গরু ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটে। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ট্রাক ও পশুগুলো উদ্ধার করে।
অভিযোগ তদন্তের আশ্বাস:
চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উত্তরাঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত হাইওয়ে পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, মহাসড়কে পশুবাহী ট্রাক থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া গেলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এরই মধ্যে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল এলাকায় ট্রাক থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগে এক উপপরিদর্শকসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, ঈদকে সামনে রেখে মহাসড়ক ও পশুর হাটে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কোথাও অবৈধভাবে টাকা আদায়ের প্রমাণ মিললে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
Leave a Reply