স্টাফ রিপোর্টার: সমাজে ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়ছে মাদক। শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিকর এই নিষিদ্ধ দ্রব্য মানুষের আচরণ ও বিচারবোধকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সাম্প্রতিক সময়ে খুন, ধর্ষণ, অপহরণ ও সহিংসতার বহু ঘটনায় অভিযুক্তদের মাদকাসক্তির তথ্য উঠে আসছে।

রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অভিযুক্ত সোহেল রানা নিয়মিত ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক সেবন করতেন বলে জানা গেছে। শুধু এই ঘটনাই নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত নৃশংস অপরাধগুলোর পেছনেও মাদকের প্রভাবের বিষয়টি সামনে আসছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকের নেশা অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে স্বাভাবিক বিবেচনাবোধ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।
মস্তিষ্কে ঘটে বড় ধরনের পরিবর্তন:
মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যালকোহলসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য মানুষের মস্তিষ্কে জৈবিক পরিবর্তন ঘটায়। মাদকাসক্ত ব্যক্তির মস্তিষ্কের কার্যক্রম স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় ভিন্ন হয়ে পড়ে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ম্যাগনেটিক রেজোনেন্স ইমেজিং (এমআরআই), পজিট্রন ইমিশন টোমোগ্রাফি (পিইটি) স্ক্যান ও অন্যান্য পরীক্ষায় আসক্ত ব্যক্তির মস্তিষ্কে স্পষ্ট পরিবর্তন ধরা পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বংশগত বৈশিষ্ট্য, পরিবেশ ও সামাজিক বাস্তবতাও মাদকাসক্তির ঝুঁকি বাড়ায়।

আন্তর্জাতিক রোগ শ্রেণিবিন্যাস (আইসিডি) এবং আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের মানসিক রোগবিষয়ক নির্দেশিকাতেও মাদকাসক্তিকে একটি মানসিক রোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
‘ভালো-মন্দ বোঝার ক্ষমতা কমে যায়’:
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মুনতাসীর মারুফ বলেন, একজন ব্যক্তি যখন মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ে, তখন তার ভালো-মন্দ ও ন্যায়-অন্যায় বিচারের ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়। মাদক মস্তিষ্কের স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে হত্যা, ধর্ষণ বা সহিংস অপরাধে জড়িয়ে পড়লেও অনেক সময় তার মধ্যে অনুশোচনা বা ভয় কাজ করে না।
তিনি বলেন, মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের কাউন্সেলিং ও চিকিৎসার আওতায় আনা জরুরি।

ইয়াবার সাময়িক উত্তেজনা, দীর্ঘমেয়াদি ধ্বংস:
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, ইয়াবা সাময়িকভাবে ব্যবহারকারীদের কৃত্রিম আনন্দ ও উত্তেজনা দেয়। কেউ কেউ এটি যৌন উত্তেজক বা ওজন কমানোর উপায় হিসেবেও ব্যবহার করে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি শারীরিক ও মানসিকভাবে ভয়াবহ ক্ষতি ডেকে আনে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. তৈয়বুর রহমান বলেন, ইয়াবা সেবনের ফলে শুরুতে শরীরে অতিরিক্ত শক্তি অনুভূত হয়, ঘুম কমে যায়, ক্ষুধামান্দা দেখা দেয় এবং ওজন কমতে থাকে। পাশাপাশি বুক ধড়ফড় করা, রক্তচাপ বৃদ্ধি ও অতিরিক্ত ঘামের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ইয়াবা সেবনের ফলে অপুষ্টি, হৃদরোগ, ব্রেন স্ট্রোক ও খিঁচুনির ঝুঁকি বাড়ে। একই সঙ্গে হতাশা, উদ্বেগ, রাগ, সন্দেহপ্রবণতা, হ্যালুসিনেশন, আগ্রাসী আচরণ এমনকি আত্মহত্যাপ্রবণতাও তৈরি হতে পারে।
চিকিৎসা ও পুনর্বাসন জরুরি:
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক অধ্যাপক ডা. মো. তাজুল ইসলাম বলেন, মাদকাসক্তি থেকে মুক্তি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও আচরণগত থেরাপির সমন্বিত প্রয়োগ এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তার মতে, চিকিৎসার পথে মাঝেমধ্যে পুনরায় আসক্ত হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকলেও চিকিৎসা বন্ধ করে দেওয়া সমাধান নয়। বর্তমানে মাদকাসক্তদের জন্য বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে এবং সঠিক চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা পেলে একজন আসক্ত ব্যক্তি সুস্থ জীবনে ফিরে আসতে পারেন।
Leave a Reply