তাহমিনা আক্তার,ঢাকা: দেশে মাদকের বিস্তার বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ছিনতাই, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, বখাটেপনা, খুন ও ধর্ষণের মতো ভয়ংকর অপরাধ। সাম্প্রতিক সময়ে পল্লবীর স্কুলছাত্রী রামিসা হত্যাকাণ্ডসহ একাধিক নৃশংস ঘটনায় অভিযুক্তদের অনেকেই মাদকাসক্ত বলে উঠে এসেছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, মাদকাসক্তি মানুষকে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে তুলছে এবং ভয়ংকর অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

বিভিন্ন অনুসন্ধান ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাদকের বিস্তারে বহু পরিবার ভেঙে পড়ছে। সামাজিক ও পারিবারিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। একসময় সিরিয়াল কিলার রসু খাঁ কিংবা সাভারের সম্রাটের মতো আলোচিত অপরাধীদের ক্ষেত্রেও মাদকাসক্তির বিষয়টি সামনে এসেছিল।
কথায় কঠোরতা, বাস্তবে দুর্বলতা
সব সরকারের আমলেই মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বলা হলেও বাস্তবে দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়নি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। তাদের মতে, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাংশের দুর্নীতির কারণেই মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত সময়ে প্রভাবশালী মাদক কারবারিদের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। ফলে পাড়া-মহল্লায় কিশোর গ্যাং ও মাদকাসক্ত তরুণদের সংখ্যা বেড়েছে।

সংশ্লিষ্টদের ধারণা, সরকারি হিসাবে মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা কম দেখানো হলেও বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা পাঁচ লাখের বেশি। কক্সবাজার, টেকনাফসহ সীমান্তবর্তী এলাকায় বড় অংশের মাদক কারবারি সক্রিয়। বস্তি থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত পরিবার, এমনকি নামকরা স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়েও মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
মাদক পরিস্থিতিকে ‘সামাজিক ব্যাধি’ বলছে অধিদপ্তর
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হাসান মারুফ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ কমে যাওয়া, সামাজিক বন্ধন দুর্বল হওয়া এবং তরুণদের মোবাইল ফোন ও অনিয়ন্ত্রিত কনটেন্টে আসক্তির বিষয়গুলো ভূমিকা রাখছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে মাদক উৎপাদিত হয় না; অধিকাংশই চোরাচালানের মাধ্যমে আসে। তাই মাদক সমস্যাকে সামাজিক ব্যাধি হিসেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। একক কোনো সংস্থার পক্ষে এ সমস্যা মোকাবিলা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বেড়েছে বিস্তার:
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতা ও নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে দেশে ব্যাপকভাবে মাদকের চালান প্রবেশ করে। বিশেষ করে টেকনাফ হয়ে ইয়াবা ও আইসের বড় বড় চালান ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মাদকবিরোধী অভিযান অনেকটা শিথিল হয়ে যায়। এ সুযোগে পুরোনো মাদক গডফাদাররা নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে।
বাড়ছে সহিংস অপরাধ:
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, খুন ও সহিংসতার ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মাদকাসক্তির অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বগুড়ায় সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া কয়েকজন আসামিকে মাদকাসক্ত বলে জানিয়েছে পুলিশ। নারায়ণগঞ্জে মাদকসেবন নিয়ে বিরোধের জেরে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। খুলনায় মাদকসেবীদের হাতে খুন হন আরেক যুবক। সিলেটে মাদকাসক্তের ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারান র্যাব সদস্য ইমন আচার্য।
এছাড়া সাভারে মাদক ব্যবসায়ীদের হামলায় আহত হয়েছেন কয়েকজন সংবাদকর্মী।
হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক:
সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত সহজলভ্য হয়ে উঠেছে ইয়াবা, আইসসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক। পাড়া-মহল্লার ছোট দোকান থেকেও মাদক সংগ্রহ করা যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তরুণদের মধ্যে মাদক গ্রহণকে অনেক ক্ষেত্রে আড্ডা ও বিনোদনের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা তরুণদের মানসিকতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

অভিযোগ রয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপ ও পেজে প্রকাশ্যেই মাদকের বেচাকেনা চলছে। নির্দিষ্ট গ্রুপে অর্ডার দিলে হোম ডেলিভারিতেও পৌঁছে যাচ্ছে মাদক।
রাজধানীর টিএসসি, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, রমনা পার্ক ও হাতিরঝিলসহ বিভিন্ন উন্মুক্ত স্থানকে মাদকের হটস্পট হিসেবে উল্লেখ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও উদ্বেগজনক বিস্তার:
মাদকের বিস্তার এখন শুধু সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ নয়; কয়েকটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ইতোমধ্যে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়কে সতর্কতামূলক চিঠি দিয়েছে। কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদকাসক্তি ঠেকাতে নিজস্ব উদ্যোগে ডোপ টেস্ট চালু করেছে।
উচ্চবিত্ত সমাজেও ছড়িয়েছে মাদক:
মাদকাসক্তি ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে উচ্চবিত্ত পরিবারের সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, সাবেক সংসদ সদস্য এবং শোবিজ অঙ্গনের কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে।

নারকোটিক্স সূত্র জানিয়েছে, অতীতে একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালানো হলেও রাজনৈতিক চাপের কারণে অনেক ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি।
আসছে নতুন নতুন মাদক:
হেরোইন, ইয়াবা ও আইসের পাশাপাশি দেশে নতুন নতুন মাদকের বিস্তার ঘটছে। এমডিএমএ, টিএইচসি, কিটামিন, কুশ, এলএসডি ও ডিওবির মতো মাদক এখন বিভিন্ন মহলে ছড়িয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
নারকোটিক্স কর্মকর্তাদের দাবি, সম্প্রতি ঢাকায় ‘জম্বি’ নামে পরিচিত এক ধরনের ভয়ংকর মাদকের অস্তিত্বও পাওয়া গেছে। এটি গ্রহণের পর ব্যবহারকারীরা অনেকটা অচেতন ও স্থবির হয়ে পড়ে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা শাখার উপপরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, আগে বাংলাদেশকে শুধু আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহার করা হলেও এখন দেশের ভেতরেও কোকেনসহ বিভিন্ন মাদকের চাহিদা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কিছু বিদেশি চক্র বাংলাদেশে নতুন বাজার তৈরির চেষ্টা করছে বলে জানান তিনি।
Leave a Reply