ডেস্ক রিপোর্ট :: লক্ষ্মীপুরে মেঘনা নদীর বিভিন্ন এলাকায় নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে চলছে মা ইলিশ শিকার। জেলার রামগতি, কমলনগর, রায়পুর ও সদর উপজেলার বিভিন্ন ঘাটে অবাধে এসব ইলিশ কেনাবেচা করা হচ্ছে। স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ী ও জেলেদের একাংশের দাবি, প্রভাবশালী কয়েকটি চক্রের ছত্রছায়ায় চলছে এ অবৈধ কার্যক্রম। এসব চক্রের সঙ্গে বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের কয়েকজন নেতা-কর্মীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠেছে। তবে অভিযুক্তরা অস্বীকার করেছেন।

এদিকে নিষেধাজ্ঞার ১১ দিন পার হলেও অনেক জেলে সরকারি খাদ্যসহায়তার চাল পাননি বলে অভিযোগ করেছেন। এতে একদিকে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে কর্মহীন জেলেদের জীবিকা নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি ও মা ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে সরকার ঘোষিত ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলছে। গত ৮ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এ নিষেধাজ্ঞা আগামী ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। এ সময় মেঘনা নদীসহ দেশের নির্ধারিত এলাকায় ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ সময়ে মাছ ধরা, পরিবহন, মজুত এবং বিক্রিও নিষিদ্ধ। নিষেধাজ্ঞার আওতায় নিবন্ধিত জেলেদের পরিবারকে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা রয়েছে। এদিকে নিষেধাজ্ঞার প্রথম ১১ দিনে ৯৩টি অভিযান চালিয়ে ৮৩ জন জেলেকে আটক করা হয়েছে।
এসব অভিযানে ২ দশমিক ২৭২ টন ইলিশ, ৯ লাখ ৫০ হাজার ৮০০ মিটার মাছ ধরার জাল, ১৪টি নৌকা ও একটি স্পিডবোট জব্দ করা হয়্য। এ ছাড়া ১০টি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অবৈধভাবে মাছ শিকার ও বহনের অভিযোগে করা ৪৯টি মামলায় ৩০ জনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার দুপুরে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার চররমণী মোহন ইউনিয়নের মজুচৌধুরীরহাট-সংলগ্ন ভাসমান জেলেপল্লি ও দক্ষিণের নদীতীরের কয়েকটি এলাকায় গিয়ে মাছ শিকার ও বেচাকেনার চিত্র দেখা যায়। তখন জেলেদের নৌকা একের পর এক ঘাটে ভিড়ে। আর মাছ ব্যবসায়ীরা নৌকা থেকে দরদাম করে ইলিশ কিনেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কোস্টগার্ডের ট্রলার এলাকায় এলে জেলে ও ব্যবসায়ীরা সতর্ক হয়ে যান। ট্রলার চলে গেলে আবারও শুরু হয় বেচাকেনা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই এলাকার কয়েকজন জেলে জানান, অভিযানের আগেও তারা নদীতে মাছ ধরতে পারেননি। এখন সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভর করে থাকলে পরিবারের খরচ চালানো কঠিন। আর ২২ দিনের জন্য ২৫ কেজি চাল দিয়ে একটি পরিবারের সব চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়।

এ সময় এক তরুণ জেলে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘শুধু আমাদের নিষেধাজ্ঞার গান শোনান কেন! মেঘনার সাহেবের চর, চর মেঘায় বড় বড় সাবার (ইলিশ ধরার ট্রলার) দিয়ে টনে টনে মাছ ধরে বিক্রি করছে। মৎস্য বিভাগ, কোস্টগার্ড ও নৌ-পুলিশ সেগুলো দেখেও না দেখার মতো করে নদীতে অভিযান চালাচ্ছে। আমরা ঘাটে কয়েকটি মাছ বিক্রি করি, সেগুলো ধরতে কোস্টগার্ড বারবার আসে। সরকার আমাদের পরিবারের দায়িত্ব নিলে আমরা মাছ ধরব না।’
রামগতি বাজার মাছঘাটসংলগ্ন ভাসমান জেলেপল্লি বা মান্তাপাড়া এলাকায় সকাল, বিকেল ও রাতে ইলিশ কেনাবেচা চলে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। চিহ্নিত কয়েকটি স্থানে মাছ কিনতে গাড়ি নিয়ে ভিড় করছেন ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয় জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বিকেলে মাছ শিকার করা আট থেকে ১০টি নৌকা সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে ঘাটে ফেরে। এ ছাড়া রাতভর মাছ শিকার করে আরও ১২ থেকে ১৫টি নৌকা ভোরের দিকে ঘাটে আসে।
![]()
মান্তাপাড়া এলাকার তিনজন মাছ ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, লক্ষ্মীপুর জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম, বিএনপির কর্মী ডলার নোমান ও হালিম মাঝির নিয়ন্ত্রণে এসব নৌকা পরিচালিত হচ্ছে। নদীতে মাছ শিকারে নামা জেলেদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া এবং পুলিশসহ বিভিন্ন পর্যায়ে সমন্বয়ের মাধ্যমে এ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
সিরাজ ব্যাপারী ও ইসমাইল মাঝি জানান, নিষেধাজ্ঞা চলাকালেও তারা ওই এলাকা থেকে মাছ কিনছেন। তাদের দাবি, সেখানে দুই শতাধিক ব্যবসায়ী নিয়মিত মাছ কেনাবেচা করেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ফজল করিম ও আবির হোসেনের অভিযোগ, গত বছরের তুলনায় এ বছর নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে প্রশাসনের তৎপরতা কম দেখা যাচ্ছে।
অন্যদিকে কমলনগরের মতিরহাট মাছঘাটে চরকালকিনি ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি হুমায়ুন কবির এবং ফারুক হোসেনের নেতৃত্বে ৫ থেকে ৭টি নৌকায় মা ইলিশ শিকারের অভিযোগ উঠেছে।
মতিরহাট এলাকার এক মাছ ব্যবসায়ীর দাবি, নিষেধাজ্ঞার মধ্যে একটি চক্র প্রায় ৩০টি মাছ ধরার ট্রলার নদীতে নামিয়েছে। এসব ট্রলারের ইলিশ সদর উপজেলার সাহেবের চরসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হচ্ছে। এ কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কিছু সদস্যের যোগসাজশ রয়েছে। তবে রামগতি ও কমলনগর উপজেলার অভিযুক্ত বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের নেতা-কর্মীরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। জেলেরা আর্থিক সংকটে পড়ছেন। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরতে নামছেন।

জেলা মৎস্য অফিসের তথ্যমতে, লক্ষ্মীপুরে সরকারি নিবন্ধিত কার্ডধারী জেলে রয়েছেন ৪২ হাজার ১৫০ জন। মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানের সময় তাদের পরিবারের জন্য ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় ১ হাজার ৫৩ দশমিক ৭৫ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এতে প্রত্যেক নিবন্ধিত জেলে ২৫ কেজি করে চাল পাওয়ার কথা। তবে বেসরকারি হিসাবে জেলায় জেলের সংখ্যা প্রায় ৬৫ হাজার।
চরকালকিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ছায়েফ উল্যাহ বলেন, ‘আমাদের ইউনিয়নে ৩ হাজার ১০০ জেলে রয়েছে। তাদের নিবন্ধন কার্ড সংগ্রহে সময় লাগায় চাল বিতরণে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। তবে গতকাল রবিবার থেকে প্রত্যেক জেলেকে ২৫ কেজি করে চাল বিতরণ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
এদিকে কমলনগরের মতিরহাট মাছঘাটের পূর্ব পাশে গত শুক্রবার সন্ধ্যায় কয়েকজন জেলেকে মাছ ধরার প্রস্তুতি নিতে দেখা যায়। ফরহাদ নামে এক জেলে মাছ ধরার দুই বস্তা জাল নৌকায় তুলছিলেন। পাশে ছিলেন জেলেপল্লির সরদার বাবুল মাঝিসহ কয়েকজন।
ফরহাদ বলেন, আমার পরিবারে ৯ জন সদস্য। অভিযান চলাকালে সরকারি কোনো সুবিধাই পাই না। মাছ ধরেই সংসার চালাতে হয়। সরকারের আইন মানতে গেলে কিস্তিওয়ালা বসবাসের নৌকা বিক্রি করে দেবে।

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার হাজিমারা, আলতাফ মাস্টারঘাট, সাজু মোল্লারঘাট ও রাউলঘাটের আশপাশেও নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ইলিশ বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে নদীতে নিয়মিত টহল, অবৈধ মাছশিকারিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং প্রকৃত জেলেদের জন্য বরাদ্দ করা চাল দ্রুত বিতরণ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে জেলেদের তালিকা প্রণয়ন ও সহায়তা বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় নিষেধাজ্ঞার কাঙ্ক্ষিত সুফল অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।
এদিকে রামগতি উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. সৌরভ-উজ-জামান বলেন, ‘অভিযুক্তদের নাম আমিও শুনে আসছি। গত দুই দিনে ওই এলাকায় কয়েকবার গিয়েছি। অভিযুক্ত জাহাঙ্গীরকে ফোনে সতর্কও করেছি। কিছু জাল ও নৌকা আটক করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে নিয়মিত অভিযান চলছে।’

লক্ষ্মীপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে শুরু থেকেই মৎস্য বিভাগ, জেলা প্রশাসন, কোস্টগার্ড ও নৌ-পুলিশ তৎপর রয়েছে। ইতোমধ্যে ৯৩টি অভিযানে ৮৩ জেলে আটক এবং ৩০ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়েছে। কিছু অসাধু জেলে বিভিন্ন স্থানে মাছ শিকারে নদীতে নামছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।
Leave a Reply