বিজ্ঞাপন:
সংবাদ শিরোনাম:
১০৮ বছরে সাদুল্লাপুর বহুমুখী পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়, এবার কি জাতীয়করণের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হবে? কালিয়াকৈরের বাড়ইপাড়া শাখা শ্রমিক ইউনিয়নের কমিটি গঠন। কালিয়াকৈরে ব্যবসায়ীর মৃত্যুর ঘটনায় আসামি গ্রেফতার ও বিচারের দাবিতে মানববন্ধন। লালমনিরহাট সীমান্তে ফেয়ারডিল সিরাপ-গাঁজা ও মোটরসাইকেল জব্দ পঞ্চগড়ে পুরোনো কাপড়ের নিচে ১২ কেজি গাঁজা! বোদায় ডিবির অভিযানে দুই যুবক গ্রেফতার” স্কুলের চাকরি, গরুর হাটে ব্যবসা! অফিস সহায়ককে ঘিরে তোলপাড় পে স্কেল ২০২৬: স্বস্তির বেতন, নাকি অর্থনীতির নতুন পরীক্ষা? আল হুফ্ফাজ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের আয়োজনে, জাতীয় হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতার লালমনিরহাট  জেলা অডিশন অনুষ্ঠিত। লালমনিরহাটে শিশু ধর্ষণ মামলায় একজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভজনপুরে অবসরজনিত বিদায় সংবর্ধনায় আবেগঘন পরিবেশ, বিদায় নিলেন শিক্ষক আব্দুর রশীদ
১০৮ বছরে সাদুল্লাপুর বহুমুখী পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়, এবার কি জাতীয়করণের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হবে?

১০৮ বছরে সাদুল্লাপুর বহুমুখী পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়, এবার কি জাতীয়করণের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হবে?

মো. জিল্লুর রহমান পলাশ: একটি শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু একটি বিদ্যালয় নয়; এটি একটি জনপদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষা-সংস্কৃতি ও প্রজন্মের স্বপ্নের ধারক। সেই অর্থে ১৯১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত সাদুল্লাপুর বহুমুখী পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয় শুধু সাদুল্লাপুরের নয়, বৃহত্তর গাইবান্ধার শিক্ষা-ঐতিহ্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিষ্ঠার ১০৮ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠানটি এখনো জাতীয়করণের বাইরে—যা সত্যিই বেদনাদায়ক এবং একই সঙ্গে প্রশ্ন জাগানিয়া।

গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে জাতীয়করণের দাবিতে আলোচনায় রয়েছে। একাধিক সময়ে জাতীয়করণের প্রতিশ্রুতি, যাচাই-বাছাই এবং তালিকার চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত গেলেও শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণ থেকে বাদ পড়েছে। ফলে শতবর্ষী এই বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারী, শিক্ষার্থী, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সচেতন এলাকাবাসীর মধ্যে দীর্ঘদিনের একটি আক্ষেপ রয়ে গেছে।

সম্প্রতি নতুন সরকার আবার সারাদেশের শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে জাতীয়করণের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে—এমন খবর সামনে এসেছে। স্বাভাবিকভাবেই এতে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক-কর্মচারী, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকসহ সাদুল্লাপুর উপজেলার সর্বস্তরের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশায় নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।

কিন্তু বিগত সময়ে চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়েও বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ হয়নি। তাই ঘুরেফিরে সবার মুখে প্রশ্ন একটাই—এবার কি শতবর্ষ পেরিয়ে ১০৮ বছরে পদার্পণ করা সাদুল্লাপুর বহুমুখী পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ হবে? অবসান হবে কি এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষার?

শতবর্ষের পথচলা

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবক ও জনহিতৈষী মানুষের উদ্যোগে সাদুল্লাপুর উপজেলা শহরের ঘাঘট নদীর পাশেই ১৯১৮ সালের ১ জানুয়ারি বিদ্যালয়টির যাত্রা শুরু হয়। শুরুতে এটি মাইনর স্কুল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করত। বিদ্যালয়টির প্রথম প্রধান শিক্ষক ছিলেন হরবিলাস চ্যাটার্জী। পরবর্তীতে বিদ্যালয়ের পরিধি ও শিক্ষাকার্যক্রম ক্রমে বিস্তৃত হয়। বিদ্যালয়টির পাশেই রয়েছে সুবিশাল খেলার মাঠ। এই মাঠে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন খেলাধুলার চর্চা হয়েছে। এখান থেকে অনেক ভালো খেলোয়াড়ও উঠে এসেছেন।

বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম শুরুর কয়েক বছর পর, ১৯২৫ সালের ১৪ আগস্ট স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি বিদ্যালয়ের নামে জমি দান করে রেজিস্ট্রি দলিল সম্পাদন করেন। এতে বিদ্যালয়ের নিজস্ব জমি ও অবকাঠামো নির্মাণের সুযোগ আরও প্রসারিত হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির নামে প্রায় ৬ একর ৫০ শতক জমি রয়েছে বলে জানা গেছে। এই জমির মধ্যে বিদ্যালয়ের ভবন, অভ্যন্তরীণ ও বাইরের মাঠ ছাড়াও ডিবি সড়কঘেঁষা জায়গায় মার্কেট ও দোকান নির্মাণ করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে।

একসময় টিনের বেড়া, টিনের চাল ও ইটের গাঁথুনির কয়েকটি কক্ষ দিয়ে যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়েছিল, সময়ের পরিক্রমায় সেটিই আজ একটি বৃহৎ ও বহুমুখী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। শতবর্ষ পেরিয়ে বিদ্যালয়টি এখনো নতুন প্রজন্মের মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে।

শিক্ষা-ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উত্তরবঙ্গের বিভাগীয় শহর রংপুর জিলা স্কুল এ অঞ্চলের প্রাচীনতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। অন্যদিকে গাইবান্ধা জেলার শিক্ষা-ইতিহাসেও সাদুল্লাপুর বহুমুখী পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। গাইবান্ধা জেলার সর্বপ্রথম ১৮৮৫ সালে গাইবান্ধা বালক বিদ্যালয়, পরে ১৯১১ সালে গোবিন্দগঞ্জ হাইস্কুল, ১৯১৩ সালে সুন্দরগঞ্জের বেলকা এমসি উচ্চ বিদ্যালয়, ১৯১৪ সালে গাইবান্ধা ইসলামিয়া হাইস্কুল, ১৯১৬ সালে গাইবান্ধা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং ১৯১৭ সালে তুলসীঘাট কাশিনাথ উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।

এই ধারাবাহিকতায় এলাকার মানুষের মাঝে শিক্ষার আলোর দ্যুতি ছড়াতে ১৯১৮ সালে সাদুল্লাপুরে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসেন কয়েকজন শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি। ফলে উত্তরাঞ্চলের শিক্ষা বিস্তারে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যুক্ত হয় সাদুল্লাপুর বহুমুখী পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।

শুধু প্রাচীন নয়, অর্জনেও সমৃদ্ধ

একটি বিদ্যালয় শুধু কত বছরের পুরোনো—তা দিয়ে তার গুরুত্ব নির্ধারণ করা যায় না। শিক্ষার্থীর সংখ্যা, শিক্ষার মান, ফলাফল, অবকাঠামো, সহশিক্ষা কার্যক্রম এবং সমাজে প্রতিষ্ঠানের অবদানও বিবেচনার বিষয়।

সেই বিবেচনায় সাদুল্লাপুর বহুমুখী পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের রয়েছে উল্লেখযোগ্য অর্জন। বর্তমানে বিদ্যালয়ে প্রায় ১ হাজার ৬৩৮ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। রয়েছে অর্ধশতাধিক শিক্ষক-কর্মচারী। মানবিক, বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখার পাশাপাশি রয়েছে কারিগরি ভোকেশনাল শাখা। বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষ, কমন রুম, আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব ও বিজ্ঞানাগার রয়েছে।
বিদ্যালয়ের বিশাল মাঠে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন খেলাধুলা, স্কাউটসহ নানা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে চলেছে।

একসময় প্রতিষ্ঠাকালীন টিনশেড ও পুরোনো একতলা ভবন জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছিল। শ্রেণিকক্ষ সংকট ছিল, ছিল না পর্যাপ্ত কমন রুমের সুবিধা। তারপরও পাঠদান থেমে থাকেনি, কমেনি শিক্ষার্থীর ভর্তি সংখ্যা। ২০০০ সালের আগেই বিদ্যালয়ে প্রথম নতুন ভবনের মুখ দেখে কারিগরি ভোকেশনাল শাখার শিক্ষার্থীরা। এরপর পূর্ব দিকে চার কক্ষের দ্বিতলা একটি ভবন হয়।

তখন ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির পৃথক শাখার ক্লাস চলত ইটের দেয়াল ও টিনের ছাউনি দেওয়া আর নতুন ভবনের শ্রেণিকক্ষে। তবে পুরনো অফিস কক্ষসহ অধিকাংশ শ্রেণিকক্ষের দরজা-জানালা ছিল ভাঙাচোরা; ছাদ ও দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ত। সংকট ছিল বিশুদ্ধ পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থায়ও।

পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ সংস্কার, বিশুদ্ধ পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন হতে থাকে। এরপর ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে বিদ্যালয়ে একটি নতুন দ্বিতল একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হয়। অর্থাৎ শতবর্ষী প্রতিষ্ঠান হলেও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়ার নিরন্তর চেষ্টা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গড়ার প্রতিষ্ঠান
সাদুল্লাপুর বহুমুখী পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় অর্জন এর প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। এখান থেকে পড়াশোনা করে অনেকে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, কৃষিবিদ, সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক, ব্যবসায়ী ও সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত থাকার পাশাপাশি অনেকে বিদেশেও বিশেষজ্ঞ, গবেষক, বিশ্লেষক ও উদ্ভাবক হিসেবে কাজ করছেন।

অর্থাৎ, বিদ্যালয়টি শুধু পাঠদান করেনি; প্রজন্মের পর প্রজন্মকে গড়ে তুলে সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

আশ্বাস-প্রতিশ্রুতি, তবু হয়নি জাতীয়করণ

শতবর্ষের এই প্রতিষ্ঠানটি বছরের পর বছর শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা রাখলেও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সরকারি পর্যায়ে প্রত্যাশিত সহযোগিতা ও অনুদান তেমন মেলেনি। অবকাঠামো উন্নয়ন ও শিক্ষক-কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধাও প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি।

বিগত সময়ে একাধিকবার জাতীয়করণের জন্য আবেদন, তথ্য প্রদান ও সাদুল্লাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। যাচাই-বাছাই ও তথ্য সংগ্রহের পর প্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণের তালিকায় একাধিকবার বিবেচনায় এলেও শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত স্বীকৃতি পায়নি।
তাই প্রশ্ন থেকেই যায়—একটি শতবর্ষী, শিক্ষার্থীসংখ্যায় গুরুত্বপূর্ণ এবং বহুমুখী শিক্ষাব্যবস্থা সমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণের জন্য আর কী যোগ্যতা প্রয়োজন

শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রত্যাশা

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. এনশাদ আলীসহ সহকারী শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাদুল্লাপুরসহ আশপাশের এলাকার শিক্ষার্থীদের কাছে প্রতিষ্ঠানটির ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। প্রজ্ঞাবান শিক্ষক ও আন্তরিক পাঠদানের কারণে শিক্ষার মান ও ফলাফলেও প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে সুনাম ধরে রেখেছে।

শিক্ষকদের মতে, বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ হলে শিক্ষক-কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি শিক্ষার মান ও অবকাঠামোগত উন্নয়নেও গতি আসবে। প্রতিষ্ঠানের বিপুল সম্পদ ও সম্ভাবনাকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো গেলে সরকারের জন্যও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সুফল তৈরি হতে পারে।

একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী হিসেবে
এই বিদ্যালয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছোটবেলা থেকেই। প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলাম এখানেই। ২০০১ সালে এই প্রতিষ্ঠান থেকেই এসএসসি পাস করি। বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ, খেলার মাঠ, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের আন্তরিকতা ও সহপাঠীদের সঙ্গে কাটানো সময় আজও স্মৃতিতে অমলিন।

এই বিদ্যালয় আমাকে শুধু পাঠ্যবইয়ের শিক্ষা দেয়নি; শিখিয়েছে শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ, মূল্যবোধ ও স্বপ্ন দেখার সাহস। পরবর্তীতে উচ্চমাধ্যমিক, বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর ও আইন বিষয়ে পড়াশোনার যে পথ তৈরি হয়েছে, তার ভিত্তি গড়ে উঠেছিল এই বিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবনেই।
আমার মতো হাজারো প্রাক্তন শিক্ষার্থীর জীবনের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির নাম জড়িয়ে আছে। কেউ চিকিৎসক, কেউ প্রকৌশলী, কেউ আইনজীবী, কেউ সরকারি কর্মকর্তা, কেউ শিক্ষক, ব্যবসায়ী বা সাংবাদিক হয়েছেন।

একটি বিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় সাফল্যই হলো তার শিক্ষার্থীদের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা।

সেই দায়বোধ থেকেই সংশ্লিষ্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে এই দাবি পৌঁছে দিতে আমার এ লেখা।

জাতীয়করণ কেন জরুরি?

জাতীয়করণ শুধু সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিক্ষার মানোন্নয়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রশাসনিক সক্ষমতা, শিক্ষক-কর্মচারীদের স্থিতিশীলতা এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ।

সাদুল্লাপুর উপজেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৬৩৮ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির পাশাপাশি রয়েছে বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা, মানবিক ও কারিগরি ভোকেশনাল শিক্ষার সুযোগ। শুধু সাদুল্লাপুর নয়, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন এবং দূর-দূরান্ত থেকেও শিক্ষার্থীরা এখানে ভর্তি হয়।

এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর উপস্থিতিই প্রতিষ্ঠানটির ওপর মানুষের আস্থা ও নির্ভরতার প্রমাণ। শতবর্ষের অভিজ্ঞতা, বিপুল সম্পদ, অবকাঠামো ও জনসম্পৃক্ততাকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে প্রতিষ্ঠানটি আরও আধুনিক, যুগোপযোগী ও মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে।

তাহলে কেন এত দীর্ঘ অপেক্ষা?

শিক্ষক-কর্মচারী, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয়রা দীর্ঘদিন ধরে জাতীয়করণের দাবি জানিয়ে আসছেন। আবেদন, স্মারকলিপি, যাচাই-বাছাই ও প্রতিশ্রুতির পরও কেন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি—এ প্রশ্নের উত্তর আজও স্পষ্ট নয়।

নাকি সুপারিশ, তদবির কিংবা ডিও লেটারের মতো বিষয়গুলোর অভাবে প্রতিষ্ঠানটি বৈষম্যের শিকার হয়েছে? নাকি ছিল অন্য কোনো প্রশাসনিক বা নীতিগত জটিলতা?

এসব প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই দিতে পারবেন। তবে এখন অতীতের হিসাব নয়; প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানটির যোগ্যতা, প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাবনাকে নতুন করে নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা।
রাজনীতি, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে শিক্ষার মান, ফলাফল, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, ঐতিহ্য, অবকাঠামো, সম্পদ ও জনসম্পৃক্ততার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক—এটাই প্রত্যাশা।

এবার চাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

সাদুল্লাপুর বহুমুখী পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয় জাতীয়করণ হলে শুধু শিক্ষক-কর্মচারী বা শিক্ষার্থীরাই উপকৃত হবে না; এর সুফল পাবে পুরো সাদুল্লাপুর উপজেলা ও আশপাশের জনপদ।
তাই এবার আর শুধু প্রতিশ্রুতি, আবেদন, তথ্য জমা ও যাচাই-বাছাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা নয়—চাই কার্যকর উদ্যোগ, চাই নিরপেক্ষ মূল্যায়ন, চাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।

সাদুল্লাপুর বহুমুখী পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়কে জাতীয়করণের আওতায় আনা হোক। এটি শুধু একটি বিদ্যালয়ের দাবি নয়; এটি একটি জনপদের শিক্ষা-ঐতিহ্যের স্বীকৃতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও সমৃদ্ধ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি।

একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী হিসেবে আমার প্রত্যাশা—১০৮ বছরের এই শিক্ষার বাতিঘর এবার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির মর্যাদা পাক। জাতীয়করণের মধ্য দিয়ে আরও সমৃদ্ধ হোক প্রতিষ্ঠানটি, পূর্ণ হোক সাদুল্লাপুরবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন।

লেখক: মো. জিল্লুর রহমান পলাশ
গণমাধ্যমকর্মী ও শিক্ষানবিশ আইনজীবী, গাইবান্ধা।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ওয়েবসাইট এর কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি।
Design & Development BY : ThemeNeed.com