বিজ্ঞাপন:
সংবাদ শিরোনাম:
হাসপাতালে চিকিৎসকদের ওপর ছাত্রদলের ‘হামলার’ প্রতিবাদ শিবিরের অর্পিত সম্পত্তি কাণ্ডের প্রশ্নে উত্তপ্ত সেই ভাইরাল ভিডিও, বাস্তবে কী ঘটেছিল? ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ একজন হারালেন চোখ, আরেকজনের মাথায় ৫ সেলাই সাংবাদিক হেনস্তার পর সাদুল্লাপুরের সেই এসিল্যান্ডকে পঞ্চগড়ের বোদায় বদলি চট্টগ্রামে গ্রেপ্তারের একদিন পর যুবলীগ নেতার মৃত্যু মসজিদের ভেতর থেকে ইমামের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার, কক্ষে মিললো চিরকুট আরেক হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হলো মমতাজকে মেসিকেও ছাড়ালেন রোনালদো, বিশ্বকাপে নতুন রেকর্ড কবিরহাটে পিকআপভ্যানের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে নিহত দুই ৪ বছরের অনার্স চার বছরেই শেষ করতে হবে: শিক্ষামন্ত্রী
অর্পিত সম্পত্তি কাণ্ডের প্রশ্নে উত্তপ্ত সেই ভাইরাল ভিডিও, বাস্তবে কী ঘটেছিল?

অর্পিত সম্পত্তি কাণ্ডের প্রশ্নে উত্তপ্ত সেই ভাইরাল ভিডিও, বাস্তবে কী ঘটেছিল?

ছবি: লেখক - জিল্লুর রহমান

শুরুতেই মোবাইল জমা দেওয়ার নির্দেশ। এরপর আঙুল উঁচিয়ে ধমক, মুহূর্তেই উত্তপ্ত পরিস্থিতি। ভাইরাল হওয়া ভিডিওর সেই দৃশ্য ঘিরে এখন জনমনে একটাই প্রশ্ন—কী এমন ঘটেছিল, যার কারণে একজন সরকারি কর্মকর্তা এতটা ক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত হয়ে উঠলেন?

একটি ভিডিও কখনো পুরো ঘটনার বিকল্প নয়, তবে ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ অংশের সাক্ষী হতে পারে। সম্প্রতি প্রকাশিত ভিডিওতে গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জসিম উদ্দিনের আচরণ নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা সহজে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে প্রশংসাসূচক পোস্ট, পক্ষাবলম্বনমূলক মন্তব্য ও সাফাই দেখা যাচ্ছে। কিন্তু কয়েকটি পোস্ট বা স্ট্যাটাস দিয়ে কোনো ঘটনার বাস্তবতা বদলে যায় না। অনিয়ম, বিতর্ক বা শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণের অভিযোগও তোষামোদমূলক লেখায় আড়াল হয় না। শেষ পর্যন্ত কথা বলে নথিপত্র, তথ্য-উপাত্ত, কর্মকাণ্ড এবং জনস্বার্থ।

ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, সালাম জানিয়ে কথা বলার চেষ্টা করা হলে মোবাইল জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপরই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একজন সরকারি কর্মকর্তার এমন আচরণ কতটা শিষ্টাচারসঙ্গত, কতটা গ্রহণযোগ্য এবং কতটা পেশাদার—সেই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

আমি পেশাগতভাবে সাংবাদিকতা করি। কারও দালালি, তোষামোদ বা অপকর্ম আড়াল করার জন্য নয়; বরং জনস্বার্থে তথ্য অনুসন্ধান, সত্য যাচাই এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্য।

যখন বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসিল্যান্ডের আচরণ নিয়ে সংবাদ ও ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে এবং অর্পিত সম্পত্তি সংক্রান্ত নানা তথ্য সামনে এসেছে, তখন কেউ নীরব থেকেছেন, আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসার অবস্থান নিয়েছেন। কিন্তু এতে বাস্তবতা বদলায় না।

প্রশ্ন উঠছে—এটি কি প্রশাসনিক শিষ্টাচার, নাকি ক্ষমতার দাপটের বহিঃপ্রকাশ?

যে সম্পত্তি নিয়ে আজ সীমানা নির্ধারণ, সরকারি সাইনবোর্ড স্থাপন ও ফটোসেশন হচ্ছে, সেটি যদি প্রকৃত অর্থেই অর্পিত সম্পত্তি হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন আসে—সরকারি অধিগ্রহণের প্রায় ৩ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ কারা, কীভাবে এবং কোন ভিত্তিতে গ্রহণ করলেন? আর যদি আগেই সঠিকভাবে মালিকানা যাচাই ও সীমানা নির্ধারণ করা হতো, তাহলে কি সরকারি অর্থ ব্যক্তি বা পরিবারের হাতে চলে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতো?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে গত ১৮ জুন বিকেলে আমরা সাদুল্লাপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে যাই। সঙ্গে ছিলেন যমুনা টেলিভিশন ও সময় টিভির জেলা প্রতিনিধি হেদায়েতুল ইসলাম বাবু।

আমাদের উদ্দেশ্য ছিল না কাউকে হেয় করা বা ব্যক্তিগত বিরোধ সৃষ্টি করা। উদ্দেশ্য ছিল সরকারি স্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি আলোচিত বিষয়ে তথ্য জানা এবং জনগণের সামনে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা।

কিন্তু প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পরিবর্তে শুরু থেকেই অস্বাভাবিক উত্তেজনা দেখা যায়। ভিডিওতে দৃশ্যমান ঘটনাগুলো নিয়ে নতুন করে ব্যাখ্যার খুব বেশি প্রয়োজন নেই। বুম ও ক্যামেরায় বাধা, মাইক্রোফোনের সাইনবোর্ড খুলে ফেলা, ক্যাবল ছিঁড়ে দেওয়া এবং সাংবাদিকদের কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অভিযোগ এখন জনসমক্ষে।

প্রশ্ন হলো—কেন?
আমরা কি ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছি?
আমরা কি উসকানিমূলক প্রশ্ন করেছি? আমরা কি অপ্রাসঙ্গিক কোনো বিষয় তুলেছি? না। আমরা শুধু জানতে চেয়েছি—একই সম্পত্তি সম্পর্কে সরকারি দপ্তরের বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য কেন? কীভাবে হাসানপাড়া মৌজার প্রায় সাড়ে ৬ শতক জমির বিপরীতে প্রায় ৩ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হলো? এবং কেন একই সম্পত্তিকে ঘিরে সরকারি নথিতে এত অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর চাওয়াই কি অপরাধ?
রাষ্ট্রের চাকরি মানে ক্ষমতার মালিক হওয়া নয়; জনগণের কাছে জবাবদিহিতার দায়িত্ব পালন করা। একজন সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্ব হলো প্রশ্নের জবাব দেওয়া, প্রশ্নকর্তাকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা নয়।

দুঃখজনকভাবে, কোনো বিতর্ক সামনে এলে কিছু মানুষ সত্য অনুসন্ধানের বদলে ব্যক্তি বন্দনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু ইতিহাস বলে, প্রশংসাসূচক স্ট্যাটাস সত্যকে আড়াল করতে পারে না। তোষামোদ জবাবদিহিতা ঠেকাতে পারে না। ফেসবুকের কয়েকটি পোস্ট কোনো বিতর্কিত ঘটনাকে প্রশ্নাতীতও করে দিতে পারে না।

সাংবাদিকতার কাজ হলো প্রশ্ন করা, তথ্য যাচাই করা, অসঙ্গতি তুলে ধরা এবং জনস্বার্থে সত্য প্রকাশ করা। এখানে দালালি, তোষামোদ কিংবা সুবিধাবাদের কোনো স্থান নেই।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়—
ক্ষমতা কি জবাবদিহিতাকে সম্মান করবে, নাকি প্রশ্নকেই অপরাধ মনে করবে?

শিষ্টাচার কি প্রশাসনের মর্যাদা বাড়াবে, নাকি ক্ষমতার দম্ভ সেই শিষ্টাচারকে গ্রাস করবে?

সময়ই তার উত্তর দেবে। কারণ সময়ের আদালতে সবচেয়ে বড় সাক্ষী হয় নথিপত্র, ঘটনা এবং মানুষের স্মৃতি।

একজন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে আমি যা লিখেছি, তা ব্যক্তিগত বিরাগ বা পক্ষ-বিপক্ষের অবস্থান থেকে নয়; বরং সরকারি নথিপত্র, তথ্য-উপাত্ত, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য এবং দৃশ্যমান বাস্তবতার আলোকে তুলে ধরেছি। ভিডিওতে যা দেখা গেছে, তার বিচার-বিশ্লেষণের দায়িত্ব পাঠকের।

শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি নয়, কথা বলবে তথ্য। অবস্থান নয়, মূল্যায়িত হবে প্রমাণ। আর মতামত নয়, ইতিহাস মনে রাখবে নথিপত্র, কর্মকাণ্ড এবং সত্যকে। সময়ের কাছেই সেই উত্তর প্রত্যাশা…

আমার এই লেখার মূল সূত্র গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরে আলোচিত অর্পিত সম্পত্তি কাণ্ড। অভিযোগ উঠেছে, ধাপেরহাট ইউনিয়নের হাসানপাড়া মৌজার সরকারের ১/১ খতিয়ানের অর্পিত ‘ক’ তফসিলভুক্ত সম্পত্তিকে ব্যক্তি মালিকানাধীন দেখিয়ে প্রায় ৩ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ উত্তোলন করা হয়েছে। সরকারি স্বার্থসংশ্লিষ্ট ওই সম্পত্তির বিপরীতে ব্যক্তি ও পারিবারিক নামে অর্থ গ্রহণের বিষয়টি ইতোমধ্যেই ব্যাপক জনআলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ঘটনাটিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে ভূমি প্রশাসনের পরস্পরবিরোধী দুটি সরকারি প্রতিবেদন। ২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বরের প্রতিবেদনে জমিতে সরকারের কোনো স্বার্থ নেই বলা হলেও, ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিলের প্রতিবেদনে একই জমিতে সরকারি স্বার্থ রয়েছে উল্লেখ করে সীমানা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়। পরে মাঠপর্যায়ে সীমানা নির্ধারণ করে জমিটিকে সরকারি অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং সেখানে সরকারি সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়।

এখানেই জনমনে বড় প্রশ্ন—যদি জমিটি প্রকৃতপক্ষে সরকারি বা অর্পিত সম্পত্তি হয়ে থাকে, তাহলে অধিগ্রহণের সময় প্রায় ৩ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ কীভাবে প্রদান করা হলো? আর যদি ব্যক্তি মালিকানাধীন হয়ে থাকে, তাহলে পরে সেটিকে সরকারি সম্পত্তি হিসেবে চিহ্নিত করার ভিত্তি কী?

আরও প্রশ্ন উঠছে, গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ ও জনআলোচনার পর হঠাৎ সীমানা নির্ধারণ ও সরকারি সাইনবোর্ড স্থাপন কি নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রম, নাকি পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত নিয়ে ওঠা প্রশ্নের প্রতিক্রিয়া?

একই সঙ্গে এসিল্যান্ডের আচরণ, নীতি-নৈতিকতা, সেবাপ্রত্যাশী ও গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে তার ব্যবহার নিয়েও জনপরিসরে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে, তার প্রশাসনিক সক্ষমতা ও দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও আলোচনার বাইরে নয়। কারণ নানা বিতর্ক ও সমালোচনার মধ্যেও তিনি সাদুল্লাপুরে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

বদলি, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে জনমনে? ৩৮তম বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর সাদুল্লাপুরে সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে যোগদান করেন এবং পরবর্তীতে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ভারপ্রাপ্ত এসিল্যান্ড হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি খাস জমি, সরকারি সম্পদ সংরক্ষণ, নামজারি ও ভূমি প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন ও অসন্তোষ রয়েছে। সাম্প্রতিক অর্পিত সম্পত্তি কাণ্ড, প্রায় ৩ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ উত্তোলনের অভিযোগ, পরস্পরবিরোধী সরকারি প্রতিবেদন এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে আচরণের ঘটনাগুলো সেই বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে।

এরআগে, রংপুর বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের ২০ এপ্রিলের প্রজ্ঞাপনে তাকে কাউনিয়া উপজেলায় বদলি করা হলেও দীর্ঘ সময় পরও নতুন কর্মস্থলে যোগদান না করার তথ্য পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে তিনি সিনিয়র সহকারী সচিব পদে পদোন্নতিও লাভ করেন।

স্থানীয়দের দাবি, বদলির আদেশ বাস্তবায়ন না হওয়া, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ঘিরে দীর্ঘদিনের বিতর্ক এবং সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে জনমনে ওঠা প্রশ্নগুলোর স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য ও তথ্যভিত্তিক জবাবও সময়ের দাবি।

শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি নয়, কথা বলবে নথিপত্র; অবস্থান নয়, মূল্যায়িত হবে তথ্য-প্রমাণ। জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট এসব প্রশ্নের উত্তরও একদিন স্পষ্ট হবেই।

সময়ের কাছেই সেই উত্তর প্রত্যাশা।

লেখক: জিল্লুর রহমান পলাশ,
গণমাধ্যমকর্মী, গাইবান্ধা


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ওয়েবসাইট এর কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি।
Design & Development BY : ThemeNeed.com