গাইবান্ধা প্রতিনিধি: গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় এক দরিদ্র অটোরিকশাচালক দম্পতির বৈধভাবে ক্রয় করা ৮ শতক বসতভিটার জমি দখলের চেষ্টা, ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, মেয়েকে অপহরণ ও গ্রামছাড়া করার হুমকির অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক প্রভাবশালী পরিবারের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে বাড়িতে হামলা-লুটপাটের সাজানো অভিযোগে পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে বলেও দাবি করেছে ভুক্তভোগী পরিবার। তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা জমি দখল, হামলা ও লুটপাটের অভিযোগ করেছে অভিযুক্ত পক্ষ।

ভুক্তভোগী রঞ্জু মিয়া উপজেলার সর্বানন্দ ইউনিয়নের তালুক সর্বানন্দ গ্রামের মৃত রইচ উদ্দিনের ছেলে। তিনি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। অভিযুক্ত আজিজার প্রামাণিক ও তার ভাই আনিছুর রহমান প্রামাণিক একই গ্রামের মৃত তালেব প্রামাণিকের ছেলে।
রঞ্জু মিয়ার দাবি, নিজের কোনো জমি না থাকায় তার স্ত্রী ফুলমালা বেগম ও নানী শাশুড়ি ফুলমতি বেগম ২০২২ সালে রেজিস্ট্রি দলিল (নং-১৪২০৭) অনুযায়ী ৮ শতক জমি ক্রয় করেন। পরে নামজারি সম্পন্ন করে সেখানে টিনের ছাপড়া ঘর নির্মাণ করে পরিবার নিয়ে বসবাস শুরু করেন।

তার অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ওই জমিকে নিজেদের দাবি করে আজিজার প্রামাণিক ও আনিছুর রহমান প্রামাণিক দখলের চেষ্টা চালিয়ে আসছেন। গত ১৮ জুলাই দেশীয় অস্ত্রসহ দলবল নিয়ে বাড়িতে এসে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, মেয়েকে অপহরণ ও ধর্ষণের হুমকি, ঘরে আগুন দেওয়ার ভয় দেখানো এবং গ্রামছাড়া করার হুমকি দেন। এসব হুমকির মোবাইল কল রেকর্ড সংরক্ষিত রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে গত ২১ জুলাই গাইবান্ধার আদালতে সিআর মামলা (নং-৫৪৫/২৬) দায়ের করেন রঞ্জু মিয়া। মামলায় আজিজার প্রামাণিক, আনিছুর রহমানসহ ৭-৮ জনকে আসামি করা হয়। এছাড়া জমি নিয়ে আদালতে চলমান ১৪৪/১৪৫ ধারার মামলায় উভয় পক্ষকে নিজ নিজ দখলীয় অবস্থান বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরপর বসতঘর মেরামতের চেষ্টা করলে প্রতিপক্ষ বাধা দেয় এবং পুলিশও কাজ বন্ধ রাখতে বলে।

রঞ্জু মিয়ার অভিযোগ, আদালতে মামলা দায়েরের পর প্রতিপক্ষ আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ভাড়াটে লোকজন দিয়ে জমি দখলের চেষ্টা, মোবাইলে হুমকি ও চাঁদা দাবি অব্যাহত রাখে। সর্বশেষ গত বুধবার (৫ আগস্ট) রাতে নিজ বাড়িতে হামলা-লুটপাটের সাজানো অভিযোগ এনে সুন্দরগঞ্জ থানায় মামলা করা হয়। ওই মামলায় আমিসহ নানা শশুর গোলজার প্রামাণিক ও তার ছেলে ফেরদৌসসহ ৫-৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় বর্তমানে পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
তিনি আরও দাবি করেন, আজিজার প্রামাণিক ২০০৪ সালে বিরোধপূর্ণ জমির একটি অংশ ক্রয় করলেও ২০১০ সালে তা অন্য ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দেন। এরপরও প্রভাব খাটিয়ে জমি দখলের চেষ্টা করছেন এবং পুলিশকে প্রভাবিত করে মিথ্যা মামলায় হয়রানি করছেন।
ফুলমতি বেগম বলেন, তার ও নাতনি ফুলমালার নামে চার বছর আগে ৪ শতক করে মোট ৮ শতক জমি কেনা হয়। সেই জমিতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করলেও এখন জোরপূর্বক উচ্ছেদের চেষ্টা চলছে। জমি দখল করতে না পেরে মিথ্যা মামলা দিয়ে ভয়ভীতি সৃষ্টি করা হচ্ছে।

ফুলমালা বেগম বলেন, ‘আমার নামে ৪ শতক এবং নানীর নামে ৪ শতক জমি রয়েছে। নিজেদের বৈধ জমিকেই প্রতিপক্ষ দাবি করছে। ঘর মেরামত করতে গেলেও বাধা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া উল্টো প্রতিপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা, হামলা ও হয়রানিমূলক অভিযোগ এনে চাপ সৃষ্টি করছে।’
ফুলমতির ছেলে ফেরদৌস প্রামাণিক বলেন, ‘আজিজার প্রামাণিক ২০১০ সালেই নিজের ক্রয় করা জমি বিক্রি করে দিয়েছেন। স্থানীয় একাধিক সালিশেও ফুলমতি ও ফুলমালার জমি কেনার বিষয়টি স্বীকার করেছিলেন। এখন সেই অবস্থান বদলে জমি দখলের চেষ্টা ও পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।’
তার দাবি, বৈধ ভাবে মা ফুলমতি ও খালা ফুলমালা ক্রয় সুক্রে ৮ শতক জমির মালিক। অথচ আজিজার প্রমাণিক প্রভাব খাটিয়ে ও ম্যানেজ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জমি দখলের জন্য উঠেপড়ে লেগেছে।
অন্যদিকে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আজিজার প্রামাণিক ও আনিছুর রহমান। হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে আজিজার প্রামাণিক বলেন, রাতের অন্ধকারে রঞ্জু মিয়াসহ কয়েকজন তাদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে হাত-পা বেঁধে মারধর ও মালামাল লুটপাট করেছে। সেই ঘটনায় থানায় মামলা করা হয়েছে। বিরোধপূর্ণ জমি তাদের পৈতৃক ও ক্রয়সূত্রে মালিকানাধীন এবং রঞ্জু মিয়ারা জোরপূর্বক দখল করে রেখেছেন।

স্থানীয় সাংবাদিকদের দেওয়া ভিডিও বক্তব্যে আনিছুর রহমান প্রামাণিক দাবি করেন, তাদের পৈত্রিক সাড়ে ৩ শতক, ক্রয় সুত্রে ৮ শতক ও ভাতিজার ক্রয় করা ৩ শতক জমি রয়েছে। ভুল রেকর্ডের সুযোগ নিয়ে প্রতিপক্ষ জমি দখল করেছে। প্রাণভয়ে কয়েক মাস ধরে তারা জমির পাশ দিয়েও চলাচল করতে পারছেন না। উল্টো তাদের বিরুদ্ধে মামলা ও হামলার অভিযোগও করেন তিনি।
এ বিষয়ে সুন্দরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহিন মোহাম্মদ আমানুল্লাহ বলেন, জমি নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ এবং আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। আজিজার প্রামাণিকের অভিযোগের ভিত্তিতে একটি মামলা হয়েছে। বিরোধপূর্ণ জমিতে কোনো ধরনের নির্মাণকাজ বা দখল পরিবর্তন না করতে উভয় পক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে পক্ষপাত, ‘ম্যানেজ’ কিংবা মিথ্যা মামলা নেওয়ার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রঞ্জু মিয়া একজন দরিদ্র অটোরিকশাচালক। বহু কষ্টে তার স্ত্রী ও নানী শাশুড়ির কেনা জমিতে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। দীর্ঘদিনের এ বিরোধকে কেন্দ্র করে এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। দ্রুত প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ না হলে যে কোনো সময় বড় ধরনের সংঘর্ষ বা হতাহতের ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পুলিশ প্রশাসন নজরদারি অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে।
Leave a Reply