গাইবান্ধা প্রতিনিধি: গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার জামুডাঙ্গা এলাকায় ঘাঘট নদীর ওপর নির্মিত সেতুর সংযোগ সড়ক ভয়াবহ ধসের মুখে পড়েছে। দেড় মাস ধরে চলমান ভাঙনে ইতোমধ্যে সড়কের একপাশের ২০০ ফুটের বেশি অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বৃষ্টি ও নদীর পানির চাপে আরও কয়েক স্থানে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। যেকোনো সময় সড়কের অবশিষ্ট অংশ ধসে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবুও প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই সড়ক ব্যবহার করছেন হাজারো মানুষ।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, ধস ঠেকাতে এখন পর্যন্ত বাঁশের পাইলিং, জিও ব্যাগ (বালুভর্তি বস্তা) ফেলা কিংবা কোনো জরুরি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এলজিইডির দাবি, সড়কটি তাদের হলেও নদীভাঙন প্রতিরোধের দায়িত্ব পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো)। অন্যদিকে পাউবো বলছে, জরুরি মেরামতের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে; অনুমোদন পেলেই আপাতত জিও ব্যাগ ও বাঁশের পাইলিংয়ের কাজ শুরু হবে।

তবে দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় সংযোগ সড়কের পাশাপাশি সেতুটিও হুমকির মুখে পড়েছে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
সাদুল্লাপুর উপজেলা শহর থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার উত্তরে দামোদরপুর ইউনিয়নের জামুডাঙ্গা গ্রামের ঘাঘট নদীর ওপর এক যুগ আগে একটি সেতুটি নির্মাণ করা হয়। জামুডাঙ্গা, মরুয়াদহ, কিশামত বড়বাড়ি, কিশামত খেজু, কামারপাড়াসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের উপজেলা শহরে যাতায়াতের এটি একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ সড়ক।
মঙ্গলবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, বর্ষার শুরুতেই নদীর তীব্র স্রোতে সেতুর দক্ষিণ পাশের সংযোগ সড়কে ধস শুরু হয়। ভাঙন অব্যাহত থাকায় সড়কটি দিন দিন সরু হয়ে যাচ্ছে। উঠে যাচ্ছে পিচ ও ইটের সলিং। সেতুর মুখসহ বিভিন্ন স্থানে বড় গর্ত ও ফাটল দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষ চলাচল করেন। রিকশা, ভ্যান, অটোরিকশা, মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনও ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম মণ্ডল বলেন, ‘বৃষ্টি ও নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সড়ক ধসে যাচ্ছে। প্রায় অর্ধেক সড়ক নদীতে চলে গেছে। দেড় মাসেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বাঁশের খুঁটি বা বালুর বস্তা ফেললেও কিছুটা রক্ষা করা যেত। এখন আরেকটু ভাঙলেই যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে।’
ভ্যানচালক আবেদ আলী বলেন, ‘প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে চলাচল করতে ভয় লাগে, বিশেষ করে রাতে। প্রতিবছরই ভাঙে, কিন্তু স্থায়ী কোনো সমাধান হয় না। এখন জরুরি মেরামত না হলে পুরো সড়কই ধসে যাবে।’

মণ্ডলপাড়ার বাসিন্দা মো. কামরুজ্জামান মণ্ডল (খোকন) বলেন, ‘ব্রিজের মুখেও বড় গর্ত ও ফাটল দেখা দিয়েছে। প্রতিবছর দায়সারা সংস্কারের নামে টাকা খরচ হয়, কিন্তু স্থায়ীভাবে নদীভাঙন রোধে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না।’
অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা মো. ফয়জার রহমান বলেন, ‘ব্রিজ নির্মাণের পরও নদীর তীরঘেঁষা সড়কটি প্রতিবছর ভাঙছে। স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় মানুষ বছরের পর বছর দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তারা পরিদর্শনে এসে আশ্বাস দিলেও বাস্তবে কাজের অগ্রগতি দেখা যায় না।’
সম্প্রতি ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেছেন গাইবান্ধা-৩ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা নজরুল ইসলাম লেবু। এ সময় এলজিইডির কর্মকর্তাসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তিনি দ্রুত মেরামত ও স্থায়ী সমাধানের আশ্বাস দেন।
দামোদরপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য আব্দুল মাজেদ মিয়া বলেন, ‘প্রতিবছরই অস্থায়ীভাবে বাঁশের খুঁটি ও বালুর বস্তা ফেলে সংস্কার করা হয়। স্থায়ী সমাধানের জন্য একাধিকবার প্রস্তাব দেওয়া হলেও বাস্তবায়ন হয়নি।’

সাদুল্লাপুর উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী মো. মেনাজ বলেন, ‘সড়কটি এলজিইডির হলেও নদীভাঙন প্রতিরোধের দায়িত্ব পানি উন্নয়ন বোর্ডের। আমরা ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেছি এবং দ্রুত ব্যবস্থা নিতে লিখিতভাবে জানিয়েছি।’
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করে জরুরি মেরামতের প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলেই বাঁশের পাইলিং ও জিও ব্যাগ ফেলে আপাতত ভাঙন প্রতিরোধের কাজ শুরু করা হবে।’
স্থানীয়দের দাবি, বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগেই জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ, বাঁশের পাইলিং ও অন্যান্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি নদীতীর সংরক্ষণ, ব্লক পাইলিং এবং সংযোগ সড়ক পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে এলজিইডি ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
Leave a Reply