গাইবান্ধা প্রতিনিধি: গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার খরকার দিঘি, জামুডাঙ্গার ঘাঘট নদীর চরসহ কয়েকটি স্থানে রাত হলেই ‘ছয়গুটি’ বা ‘ফরডাবুর’ জুয়ার আসর বসছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে জুয়ার পাশাপাশি প্রকাশ্যে মদ, গাঁজা ও ইয়াবা সেবনের আসরও চলছে বলে দাবি স্থানীয়দের। তাদের অভিযোগ, সংঘবদ্ধ জুয়ারি চক্রের আয়োজনে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার জুয়া লেনদেন হচ্ছে। এতে অনেকে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন, বাড়ছে চুরি-ছিনতাইসহ নানা অপরাধ। রাতভর জুয়াড়িদের আনাগোনা, মাদকসেবীদের উৎপাত ও মোটরসাইকেলের শব্দে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন আশপাশের বাসিন্দারা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, একাধিকবার প্রশাসনকে জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের দাবি, বিভিন্ন মহলকে ম্যানেজ করেই জুয়ার আসর নির্বিঘ্নে পরিচালিত হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার ফরিদপুর ও ভাতগ্রাম ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী খোদাবক্স গ্রামের খরকার দিঘির দক্ষিণ পাড় এবং নলডাঙ্গা সড়কের ঘাঘট ব্রিজসংলগ্ন জামুডাঙ্গা বাঁধের পূর্ব পাশে নদীর চরে বাঁশ ও ত্রিপলের সামিয়ানা টাঙিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত জুয়া চলে। এছাড়া মিরপুর, মহেশপুর, ভাজাকালাই নদীসংলগ্ন এলাকাসহ আরও কয়েকটি স্থানে নিয়মিত জুয়ার আসর বসছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

স্থানীয়দের ভাষ্য, সন্ধ্যার পর থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনে জুয়াড়িরা আসতে শুরু করেন। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জমে ওঠে জুয়ার আসর। একই সঙ্গে চলে মদ, গাঁজা ও ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক সেবন। প্রতিবাদ করলে হুমকি-ধমকির মুখে পড়তে হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, খোদাবক্স গ্রামের মজিদুল ইসলাম জুয়ার আসরের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেন। তার সঙ্গে মহেশপুর গ্রামের এমদাদুল, নুরুন্নবী, কৃষ্ণপুর গ্রামের অদু মিয়া ও হবিল্লাপুরের অনিল সরকারসহ কয়েকজন জড়িত। অন্যদিকে জামুডাঙ্গা এলাকায় স্থানীয় মঞ্জু, রেজ্জাক ও মাসুদের নেতৃত্বে জুয়ার আসর পরিচালিত হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দার অভিযোগ, প্রতিদিন বিপুল অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন মহলকে ম্যানেজ করেই জুয়ার আসর চালানো হয়। তাদের দাবি, এসব আসরে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার লেনদেন হয়। ত্রিপলের সামিয়ানা থাকায় বৃষ্টি হলেও খেলা বন্ধ হয় না এবং জুয়াড়িদের মোটরসাইকেল রাখারও আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে।

জামালপুর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য মো. সাইদুর রহমান বলেন, ‘রাত হলেই উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ফরডাবুসহ নানা ধরনের জুয়ার আসর বসছে। জুয়া খেলে অনেক পরিবার নিঃস্ব হচ্ছে। এর প্রভাবে চুরি-ছিনতাই ও সামাজিক অপরাধ বাড়ছে। দীর্ঘ সময় ধরে প্রকাশ্যে জুয়া চললেও কার্যকর ব্যবস্থা চোখে পড়ে না। বারবার অভিযোগ করেও স্থায়ী কোনো প্রতিকার মেলেনি।’
খরকার দিঘির জুয়ার আসর প্রসঙ্গে ভাতগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মাহাফুজার রহমান মাফু বলেন, ‘জুয়া বন্ধে বহুবার চেষ্টা করেছি। থানা পুলিশকে জানিয়েছি। কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা হয়নি। বরং জুয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে বিভিন্ন মহল থেকে চাপ আসে।’
বিভিন্ন স্থানে জুয়ার আসর বসায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বাংলাদেশের ওয়াকার্স পার্টির সাদুল্লাপুর উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক কমরেড কামরুল ইসলাম বলেন, ‘সমাজকে অবক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে জুয়ার বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে জনসচেতনতা ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে জুয়া নির্মূলে পুলিশ-প্রশাসনকে আরও কঠোর ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। তা না হলে আরও অনেক পরিবার সর্বস্বান্ত হবে, পাশাপাশি চুরি, ছিনতাই ও অন্যান্য অপরাধও আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাবে।’

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতেও জামুডাঙ্গা বাঁধসংলগ্ন এলাকায় বাঁশ ও ত্রিপলের সামিয়ানা টাঙিয়ে রাতের আঁধারে জুয়ার আসর বসার দৃশ্য দেখা গেছে বলে স্থানীয়রা জানান। তাদের ভাষ্য, প্রতিবাদ করলেও নানা ধরনের চাপ ও ভয়ভীতির মুখে পড়তে হয়।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সাদুল্লাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম হাবিবুর রহমান বলেন, ‘জুয়ার বিরুদ্ধে পুলিশ সবসময় অভিযান পরিচালনা করছে। সম্প্রতি ধাপেরহাট এলাকায় অভিযান চালিয়ে কয়েকজন জুয়ারিকে আটক করা হয়েছে। কোথাও জুয়ার আসর বসার তথ্য পেলেই তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করা হবে। এ ধরনের অপরাধে যারাই জড়িত থাকুক, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জুয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের ওসি আব্দুল মোত্তালিব সরকার বলেন, ‘জুয়ার খবর পেলেই অভিযান চালানো হয়। তবে অধিকাংশ আসর খোলা মাঠ, নদীর চর বা নির্জন স্থানে হওয়ায় পুলিশ পৌঁছানোর আগেই জুয়াড়িরা পালিয়ে যায়। পুলিশ সুপারের নির্দেশে জুয়া, মাদক ও ক্যাসিনো চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’

শুধু খরকার দিঘি ও জামুডাঙ্গার নদীর চরেই নয়, মিরপুর, মহেশপুর, ভাজাকালাই নদীসংলগ্ন এলাকাসহ আরও কয়েকটি স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে জুয়ার আসর বসছে বলে জানা গেছে।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঝে মাঝে লোক দেখানো অভিযান চললেও জুয়ার আসর পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না। তাদের দাবি, উঠতি বয়সী যুবক ও শিক্ষার্থীদের একটি অংশ জুয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ছে, বাড়ছে সামাজিক অবক্ষয় ও অপরাধপ্রবণতা। তাই দ্রুত জুয়ার আসর উচ্ছেদ, মাদক কারবার বন্ধ এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
Leave a Reply